মঙ্গলবার, জুন ১১, ২০২৪
Homeঅর্থকড়ির জগৎসস্তা ঘাম, রক্ত ও লাশের উপর দাঁড়িয়ে আছে যে শিল্প

সস্তা ঘাম, রক্ত ও লাশের উপর দাঁড়িয়ে আছে যে শিল্প

১৯৮০-র দশকের গোড়া থেকে বাংলাদেশে যে গার্মেন্ট শিল্পের বিকাশ হতে থাকে, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে তা শেষ পর্যন্ত বিশ্বের দ্বিতীয় স্থান অর্জনের গৌরব অর্জন করে। এই গার্মেন্ট শিল্পের শ্রমিকদের একটা বড় অংশ হচ্ছেন, এদেশের নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা নারীরা, যারা পেটের দায়ে ও বেঁচে থাকার তাগিদে সমাজের মানুষদের নেতিবাচক মনোভাব ও মৌলবাদীদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা ও অপ্রাসঙ্গিক বস্তুতে পরিণত করে গার্মেন্ট শিল্পে কাজ করে যাচ্ছেন এখনো।

আমাদের গার্মেন্ট শিল্পের এই আপাত গৌরবের ও অর্জনের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে ভয়াবহ অন্যায্যতা ও নির্মমতা। আমরা জানি, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় একজন মালিক শ্রমিকের উদ্বৃত্ত শ্রম শোষণ করেই নিজেদের মুনাফার পাহাড় গড়ে তুলেন। কিন্তু এই শোষণেরও একটা মাত্রা ও শৃঙখলা বজায় রাখে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার অধীনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার উপর জোর প্রদান করা হয়ে থাকে ৷ যেমন,আর এম জি বা রেডিমেড গার্মেন্ট সেক্টরে শ্রমিকদের ন্যুনতম বেতন সম্পর্কে ILO (International Labour Organisation)-র বক্তব্য হলো, “minimum wages should be set at levels that provide workers with a decent standard of living, taking into account the specific economic and social context of each country.”

ভারত ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোও যখন ILO-র এই বক্তব্য অনুযায়ী শ্রমিকের বেতন কাঠামো নির্ধারণ করছে, আমাদের দেশে ঘটছে তার উল্টো ঘটনা। পুঁজিবাদের স্বাভাবিক শোষণ- শৃঙ্খলাও যেন মানতে চাইছেন না আমাদের দেশের গার্মেন্ট শিল্প মালিকরা। শ্রমিকদের দুবেলা শুধু পেটভরে খেয়ে জীবন ধারণ করার মতো মজুরিও দিচ্ছেন না তারা। বাধ্য হয়ে এই অমানবিক ও নির্মম মজুরি কাঠামো মেনে নিয়েই গার্মেন্ট শিল্পে শ্রম দিতে হচ্ছে শ্রমিকদের। শুধু তাই নয়, এই গার্মেন্ট কারখানাগুলাতে শ্রমিকদের স্বাভাবিক ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়েছে৷ এসব শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই কোন নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না, স্বাস্থ্যগত ও জীবনের নিরাপত্তার কোন সুব্যবস্থা নেই। স্পেক্ট্রাম, তাজরিন, রানা প্লাজার মত কারখানাগুলোতে মালিকশ্রেণির অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে অগ্নিকাণ্ড কিংবা ভবন ধ্বসে পড়ার মতো দুর্ঘটনায় নির্বিচারে শ্রমিকদের মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অবহেলাজনিত এসব মৃত্যু হত্যাকাণ্ডেরই শামিল।

দেখা যাচ্ছে, এদেশের গার্মেন্ট শ্রমিকদের যখন ন্যূনতম মানবিক মজুরি ও মর্যাদা, সবকিছু থেকেই বঞ্চিত করা হচ্ছে, তখন শ্রমিকদের এই নির্মম সস্তা শ্রমকে এখানে গৌরবের বিষয় হিসাবে দেখানো হচ্ছে। কারণ শ্রমিকের এই সস্তা শ্রমকে পুঁজি করেই এখানকার গার্মেন্ট শিল্প আজ পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। ‘সস্তা শ্রম’ নামের লজ্জাকর নির্মম তকমাটা নিয়ে কোন রকম অপরাধবোধ নেই, আমাদের সরকার কিংবা গার্মেন্ট শিল্প মালিকদের কারোরই। মজুরি বৃদ্ধির প্রসঙ্গ এলেই সরকার বাহাদুর ফিরিস্তি দিতে বসে যান, কোন বছর মজুরি কতো ছিল, আর কবে তারা কতো বৃদ্ধি করেছেন!

শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে শ্রমিকদের বেতন পুনরায় নির্ধারণ করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু কোন বারই শ্রমিকদের রাস্তায় না নামা পর্যন্ত, রক্ত ও জীবন ঝরা না পর্যন্ত, গার্মেন্ট কারখানার মালিক ও সরকারের টনক নড়ে না। ২০১৮ সালে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২৭০০ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার টাকা। এর আগে ২০১৩ সালে যা ছিল পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা। উন্নয়নের মুখোশে হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাট, লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের কারণে দেশে যে অর্থনৈতিক সংকট ও তীব্র মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে, তার পরিণামে এখানকার মধ্যবিত্তদেরও নিত্য জীবনযাত্রা বহন করা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় স্বল্প মজুরি পাওয়া শ্রমিকরা কী করুণ অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, বলাই বাহুল্য। ফলে এই তীব্র মূল্যস্ফীতিতে পোশাক শ্রমিকেরা খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য ২৫ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছেন অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে। একে অযৌক্তিক দাবি বলে উল্লেখ করে বিজেএমইএ এবং সরকারের পক্ষ থেকে ৮ হাজার টাকা থেকে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ন্যূনতম মজুরি ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে।

২০১৮ সালে যখন ৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়, তখন ডলার পাওয়া যেতো ৮০ টাকায়। সেই হিসেবে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ছিল ১০০ ডলার। এইবার গার্মেন্ট শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি যেদিন ১২ হাজার ৫০০ টাকা ঘোষণা দেওয়া হলো, সেদিন খোলা বাজারে প্রতি ডলার লেনদেন হয়েছে ১১৯ থেকে ১২০ টাকায়। ৮ নভেম্বরের দৈনিক বনিকবার্তা পত্রিকা বলছে, আন্তর্জাতিক মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান “ট্রান্সফাস্টের” কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১২৪ টাকা দরেও রেমিটেন্সের ডলার কিনেছে দেশের অনেক ব্যাংক। আর ৯ নভেম্বর খোলা বাজারে ডলার বিক্রি হয়েছে ১২৭ টাকায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, টকার মানের এতো দ্রুত পতন ঘটছে যে, মজুরি বাড়ানোর পরও জানুয়ারি মাসে মজুরি হাতে পেতে পেতে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি আগের থেকে কমে যাবে।

শ্রমিকদের এই আন্দোলন কোন সরকার পতনের আন্দোলন ছিল না। অথচ বিনা উস্কানিতে পুলিশ এই আন্দোলনে শ্রমিকদের হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালিয়েছে বারবার। ঘটনাস্থলে আঞ্জুয়ারা নামের একজন নারী শ্রমিকসহ তিনজন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। পরবর্তীতে হাসাপাতালে গুলিতে আহত আরেকজন শ্রমিক মারা যান। নিজেদের ন্যায্য অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিলেন চারজন শ্রমিক৷ সরকার শ্রমিকদের টাকায় কেনা গুলি দিয়ে তাদেরই জীবন কেড়ে নিয়েছে। আহত কয়েছে শতাধিক। কিন্তু এরপরেও শ্রমিকদের দাবি মেনে না নিয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে দেওয়া হলো।

এই বিষয়ে গার্মেন্ট শিল্প মালিকদের বক্তব্য হলো, শ্রমিকদের মজুরি ২৫ হাজার টাকা করলে উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাবে। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘সস্তা শ্রমের’ মত লজ্জাজনক তকমা নিয়ে চলতে থাকা এই শিল্পের অধিপতীরা বলছেন, মজুরি বাড়ালে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাবে। অথচ বর্তমান মজুরি কাঠামো অনুসারেও প্রতি বছর ঈদের বোনাসের মত ন্যায্য পাওনাটাও তারা শ্রমিকদের দিতে পারেন না, দেন না। এইভাবে নিজেদের ব্যর্থতা, নিজেদের নির্লজ্জ লোভের দায় চাপিয়ে দিচ্ছেন তারা পোশাক শ্রমিকদের উপর। তাহলে একই রপ্তানি বাজারে গার্মেন্টস পণ্য বিক্রি করেই ভারত, ভিয়েতনাম, চীন ইত্যাদি দেশ কীভাবে বাংলাদেশের দ্বিগুণ, তিনগুণ মজুরি দেন শ্রমিকদের?

সম্প্রতি বেতন বৃদ্ধির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র আলোচনা সভায় আটলান্টিক পোশাক কারখানার মালিক জহির উদ্দিন স্বপন ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, “প্রতি মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নানান কাজের জন্য ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এখন এনবিআর কর্মকর্তারা যদি বলেন কাল থেকে ঘুষ নেওয়া বন্ধ করে দেবেন, তাহলে আগামীকাল থেকেই আমরা শ্রমিকদের বেতন বাড়িয়ে দেব।” তাহলে দেখা যাচ্ছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের লুটপাট এবং
মালিকদের অদক্ষতার দায়ভার শ্রমিকদের শোধ দিতে হচ্ছে জীবন দিয়ে, অর্ধাহারে থেকে।

১২ হাজার ৫০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি শ্রমিকরা প্রত্যাখ্যান করলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী হুকুম দেন, এই মজুরি কাঠামোতেই কাজ করতে হবে। অথচ হত্যাকারী পুলিশের বিচার নিয়ে উনি একটি কথাও বলেননি। শ্রমিকদের মৃত্যু নিয়ে কোন প্রকার দু:খ প্রকাশ পর্যন্ত করেননি। আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনরা সরকারের কাছে, মালিকদের কাছে কোন মানুষই না; তাদের মুনাফার পাহাড় তৈরির উপকরণ ছাড়া।

পোশাক শ্রমিকদের ঘাম, রক্ত ও লাশের উপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের গার্মেন্ট শিল্প। পোশাক শ্রমিকদের উপর চালানো এই নির্মম পুলিশি হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে হবে। পোশাক শ্রমিকদের মজুরি ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীকে এই ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার। কারণ এই পোশাক শ্রমিকদের শ্রমই আমাদের অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড।

পোশাক শিল্প শ্রমিকরা বিজিএমইএ ঘোষিত ১২ হাজার ৫০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ৪ জন সহকর্মী, সহযোদ্ধাকে হারিয়েও তারা এখনো ২৫ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে রাজপথে রয়েছেন। আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। আন্দোলনরত একজন অসহায় গার্মেন্ট শ্রমিক একটি মিডিয়ায় সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, “বেতন বাড়াইতে হবে না। খালি আমার বেতন দিয়ে আমারে একমাস চালায়া দেখান। ঐ মতেই চলবো।”

আমরা বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ এবং গার্মেন্ট শিল্প মালিকদের বলবো, আগে নিজেরা ১২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে আপনাদের ঘরভাড়া, বাচ্চার পড়াশোনা, চিকিৎসা, সারা মাসের খাবার, আনুষঙ্গিক সংসার খরচ ঠিকঠাক মতো চালিয়ে দেখান। তারপর শ্রমিকদের এই পরিমাণ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করেন, শ্রমিকরা বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নিবেন।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাম্প্রতিকা