১.
বেশ্যা বানালো কে:
‘ডাকসু মাদকের আড্ডাখানা ছিল, বেশ্যাখানা ছিল’- বলেছেন জনৈক জামাত নেতা। ‘ছিল’ বলেছেন কেন না ওই নেতা মনে করেন বর্তমানে ডাকসু কোন বেশ্যাখানা নয়। কারণ বর্তমান ডাকসুর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যই জামাতের দলদাস, যারা কখনোই কোন ভুল বা পাপ করতে পারেন না। ডাকসু নির্বাচনের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কী কী ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে তা বিচার করার ভার বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছি, যারা ভোট দিয়ে ডাকসু প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করেছেন। এখানে ‘বেশ্যা’ গালি-তেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের ‘বেশ্যা’ বলার চর্চা বাংলাদেশে বেশ পুরাতনই। সেদিক থেকে দেখলে জামাতের ওই নেতা নতুন কোন কাজ করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলে মেয়েদের চরিত্র ঠিক থাকবে না এরকম আশঙ্কা আমাদের এলাকায় সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই আছে, বিশেষ করে গ্রাম-মফস্বলে। সময়ের সাথে সাথে অনেক পরিবর্তন হয়েছে নিশ্চয়ই। নারীশিক্ষার হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা নারীর সংখ্যাও উত্তরোত্তর বাড়ছে। কিন্তু আমাদের পুরুষ-শাসিত সমাজের ‘বেশ্যা’-ভীতি এখনও পুরোপুরি কাটেনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের নিয়ে প্রচণ্ড অশ্লীল কন্টেন্ট দেখা যায় যেখানে মূল বক্তব্যই হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা শিক্ষা যতই লাভ করুক তাদের ‘শালীনতা-বোধ’ হারিয়ে যাচ্ছে, ‘চরিত্র’ খারাপ হয়ে যাচ্ছে এবং… তারা ‘বেশ্যা’ হয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করেন যেসব নারী শিক্ষার্থী তাদের অবস্থা আরও করুণ। সবচেয়ে অশ্লীল রসিকতাগুলো বোধ হয় তাদেরকে নিয়েই হয়। ‘নেতার খাঁট কাঁপানো’ এইসব মেয়েদের যেকোন হেনস্থাই ফেসবুকে অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সঙ্গে উদযাপিত হয়। বামপন্থী রাজনীতি করেন যেসব নারী তারা তো সারাক্ষণই দৌঁড়ের উপরে থাকেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে ধর্মভিত্তিক ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নারীরাও তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অশ্লীল রসিকতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। রাজনৈতিক মেরুকরণ যতো বাড়ছে, স্লাইশেইমিংও উভয় মেরু থেকে ততই তীব্র হচ্ছে। বিবেচনাবোধ যে কারোরই নেই তা নয়। কিন্তু নারী রাজনৈতিক কর্মীদের হেনস্থা করার জন্য রাজনৈতিক বর্গ হিসেবে ‘বেশ্যা’ বা সমতুল্য শব্দ-বাক্যের ব্যবহার এক ভয়ানক অসুস্থ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে আমাদের দেশে। কতিপয়ের বিবেচনাবোধ সেখানে কোন পার্থক্য তৈরী করতে পারছে না ।
বেশ্যা মূলত কারা বা বেশ্যাবৃত্তি কাকে বলে, কেন অনেক নারী বেশ্যাবৃত্তিতে যুক্ত হন, বেশ্যা হওয়া কি নিতান্তই একটা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নাকি এটা একটা সামাজিক নির্মাণ- এই প্রশ্নগুলো আপাতত মূলতবি রাখছি। এখানে কেবল একটা প্রশ্ন করি: বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা কী এমন কাজ করে যে তাদেরকে আর কিছু না বলে সরাসরি বেশ্যাই বলা হয়? এর উত্তর তারাই হয়তো ভালো জানে, যারা ‘বেশ্যা’ গালিটা দেয়। তবে আমার দৃষ্টিতে একটু তাত্ত্বিক ভাষায় গোটা ব্যাপারটার উপসংহার টানা যায় এইভাবে: পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যে নারী নিজের শরীর নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, নিজেকেই নিজের শরীরের স্বত্বাধিকারী মনে করে, সে-ই সমাজের চোখে ‘বেশ্যা’ হিসেবে পরিগণিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মেয়েদের মধ্যে যেহেতু নারী হিসেবে নিজেদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধিকারবোধ তুলনামূলকভাবে বেশি এবং যেহেতু শিক্ষিত নারীর মধ্যে নিজ ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতা সম্পর্কে এক ধরনের আত্মমর্যাদাবোধ জন্ম নেয়, সেহেতু শিক্ষিত নারীকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করার জন্য পুরুষতন্ত্রকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। শিক্ষিত নারীর সামনে পুরুষতন্ত্রের এই অনিরাপত্তাবোধ থেকেই সম্ভবত ‘বেশ্যা’ গালির জন্ম। পুরুষতন্ত্র সম্ভবত ‘বেশ্যা’-র চেয়ে নিকৃষ্ট কোন নারীর কথা কল্পনা করতে পারে না, তাই বিপজ্জনক ও অপছন্দের নারীকে ‘বেশ্যা’ গালি দিয়ে পুরুষতন্ত্র তার আত্মমর্যাদায় ফাটল ধরাতে চায়। শিক্ষিত নারীর উপর তার আক্রোশ একটু বেশিই। কারণ শিক্ষিত নারীরা চায় জীবিকাগ্রহণ, বিবাহ, তালাক, পর্দা, সন্তানগ্রহণ ইত্যাদি নারীদেহের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ব্যাপারগুলোয় অপেক্ষাকৃত স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা এই কারণেই ‘বেশ্যা’। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় মূলত একটি নাগরিক ব্যাপার। নগর এলাকায় সামাজিক অনুশাসন যেহেতু কিছুটা ঢিলেঢালা, সেহেতু নারী-পুরুষ উভয়ের পক্ষেই নিয়মভঙ্গ করা এখানে বেশ সহজ। সমস্যা হলো পুরুষের নিয়মভঙ্গ পুরুষতন্ত্র প্রশ্রয়ের চোখে দেখতে পারলেও নারীর নিয়মভঙ্গ সে সহ্য করতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রি-মিক্সিং বা খোলামেলা পোশাক যে আমাদের সমাজে নিন্দিত, তার একটা কারণ এটাই। নারী রাজনৈতিক কর্মীরা এই কারণেই শিকার হন নানা ধরনের গালাগালি ও হেনস্থার। ডাকসুকে যখন ‘বেশ্যাখানা’ বলা হয় তখন টার্গেট করা হয় মূলত সেই ‘শিক্ষিত রাজনৈতিক নারী’-কেই, যাকে সহজে বশ করা যায় না। যে নিয়ম মানে না। যে নিজ শরীরের মালিকানা দাবি করে। ফলে বিকেল পাঁচটার পর মেয়েরা সেন্ট্রাল ফিল্ডে গেলে ‘বেশ্যা’ হয়ে যায়। রাত দশটার পর মলচত্বরে গেলে ‘বেশ্যা’ হয়ে যায়। ফুলার রোডে বসে প্রেম করলে ‘বেশ্যা’ হয়ে যায়। মেয়েদের হল সারা রাত খোলা রাখার দাবি তুললেও তারা ‘বেশ্যা’ হয়ে যায়। বিনা চিন্তায় ও বিনা দ্বিধায় বলে দেওয়া যায় যে, এই ‘বেশ্যা’রাই সংসারে অশান্তির জন্য দায়ী। এই ‘বেশ্যা’রাই বিবাহ বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধির জন্য দায়ী। এই ‘বেশ্যা’দের কারণেই বাঙালির অনেক সাধের যৌথ পরিবার ফিরিয়ে আনা আর সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশে নারী হিসেবে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায় করতে গেলে এই ‘বেশ্যা’ উপাধি গলাধঃকরণ না করে কোন উপায় নেই। এবং এই উপাধি যে শুধু গ্রামের পুরুষ ও মোল্লারাই দেবে, এমন নয়। সুশিক্ষিত, নাগরিক পুরুষও গুতোয় পড়লে নারীকে ‘বেশ্যা’ বলে ক্ষোভ মেটাতে চাইবে। হয়তো পেশাগত কোন কারণে। হয়তো পারিবারিক কারণে। হাস্যকর শোনালেও আমাদের ‘প্রগতিশীল’রাও এক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবেন না। কাজী নজরুল ইসলাম প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বেশ্যা বানালো কে?’ উত্তরটা প্রশ্নের আকারে দিলেই সবচেয়ে ভালো হয়, ‘বেশ্যা বানায় না কে?’
২.
‘শাহবাগী নারী’রা কি জুলাইয়ে রাস্তায় নামে নাই:
রেহনুমা আহমেদের ‘সিপি গ্যাং-এর “বেশ্যা ব্যানার”: নৈতিক স্মৃতিচারণ হিসেবে ইতিহাস’ বইটা প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৬ সালে। বইয়ের নিবন্ধগুলো লেখা হয়েছিল ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনের সময় সিপি গ্যাং নামক উগ্র, ‘প্রগতিশীল’ গ্রুপের ‘…এইসব স্বাধীনতা বিরোধী বু্দ্ধিবেশ্যাদের প্রতিহত করতে হবে’ শীর্ষক ব্যানার ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে। বইটায় বেশ তীক্ষ্ণ ভাষায় লেখক ‘বেশ্যা’ গালির রাজনৈতিক তাৎপর্য, বেশ্যাদের জীবন ও বেশ্যাবৃত্তির ইতিহাস, দিনাজপুরের ইয়াসমিন-ধর্ষণসহ বহু বিষয়ে অত্যন্ত মূল্যবান পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেছেন। বইয়ের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে আছে কীভাবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বাঙালি জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে বীরাঙ্গনাদের ত্যাগের ইতিহাস উপেক্ষিত ও অবমূল্যায়িত হয়েছে তার বিশ্লেষণ। বইটা আকারে খুব বেশি বড় নয়। কিন্তু এর বক্তব্যগুলি এখনও এতটাই প্রাসঙ্গিক যে বইটা প্রথম প্রকাশের দশ বছর পরেও বিভিন্ন কাজে বইটার শরণ নিতে হয়।
‘বুদ্ধিবেশ্যা’ শব্দটাকে প্রবলেমাটাইজ করেই বইটার শুরু। দুঃখের ব্যাপার হলো ‘বুদ্ধিবেশ্যা’ শব্দটা এখনও হামেশাই ব্যবহৃত হয় আমাদের রাজনৈতিক অ্যাক্টভিজমের অঙ্গনে। সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয় লেখক ও অ্যাক্টিভিস্টরা এই শব্দ ব্যবহারের প্রলোভন সামলাতে পারেন না সহজে। উদাহরণস্বরুপ, ২০২৫ সালের ১৪ই ডিসেম্বরে জনপ্রিয় লেখক সাদিকুর রহমান খান ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছেন যেখানে বলা হচ্ছে,
“একদিনে হাদিকে গুলি করা হয়নি। বরং গত দুই মাস যাবত বুদ্ধিবেশ্যার দল হাদিকে ট্রল, কটুক্তি আর গালিগালাজ করে করে হাদিকে পরিণত করা হয়েছিল ঊণমানুষে।”
বুদ্ধিজীবীদের প্রতি ক্ষোভ ঝাড়তে ‘বেশ্যা’ শব্দের এই ব্যবহারের মনস্তত্ব কিছুটা হলেও বুঝতে পারা যাবে রেহনুমা আহমেদের বইটা পড়লে। বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীদের সততা/অসততার প্রসঙ্গ উঠলে বেশ্যা/পতিতাদের রেফারেন্স দেওয়া অবশ্য নতুন কোন ঘটনা নয়। প্রয়াত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ যেমন লেখেন,
বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
রাজনীতিকের ধমনী শিরায় সুবিধাবাদের পাপ
বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
বুদ্ধিজীবীর রক্তে স্নায়ুতে সচেতন অপরাধ
বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
জাতির তরুন রক্তে পুষেছে নির্বীর্যের সাপ।
‘বুদ্ধিবেশ্যা’ শব্দটা আমাদের রাজনৈতিক অভিধানের স্থায়ী জায়গা দখল করে নিয়েছে বলা যায়। এই শব্দের ব্যবহার কমার কোন সম্ভাবনা কোথাও দেখতে পাই না। ‘বেশ্যা’ শব্দের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ২০১৩ সালের সেই সিপি গ্যাং আজ আর নেই, যদিও সেই গ্যাংয়ের সদস্যরা জীবিত ও সক্রিয় আছেন। রাজনৈতিক কারণে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে তাদের প্রায় সবাই এখন মোটামুটি পরিত্যক্ত। কিন্তু জুলাইয়ের পরে যে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক রাজনীতির উদ্ভব ও জয়জয়কার ঘটেছে, সেখানে নারীর বেশ্যাকরণ কি কমেছে? গণ-অভ্যুত্থানের ব্যানার সামনে রেখে যারা আজ রাজনীতি করছেন এবং প্রায়শই গণ-অভ্যুত্থানের মালিকানা দাবি করছেন তারা কতটুকু আগ্রহী বাংলাদেশে শিক্ষিত রাজনৈতিক নারীর বি-বেশ্যাকরণে?
উত্তর হলো: আগ্রহ নেই কোন পক্ষেই। বরং ‘বেশ্যা’ গালিরই সমার্থক এক বা একাধিক গালির পুনঃপ্রচলন ও নয়া-প্রচলন ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ‘বিপ্লবী’ দুনিয়ায়। এর মধ্যে প্রধানতম গালি হচ্ছে ‘শাহবাগী’। ‘শাহবাগী’ গালি নারী-পুরুষ উভয়ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ‘শাহবাগী নারী’ বলতে সচরাচর যেটা বোঝানো হয়, সেটা ওই ‘বেশ্যা’ই। শাহবাগী নারী হচ্ছে এমন এক নারী যে ফ্রি-মিক্সিংয়ে বিশ্বাসী, যে খোলামেলা পোশাক পরে এবং পর্দা করে না, যে হয়তো তার সতীর্থ পুরুষ বন্ধুটির মতোই সিগারেট খায়। প্রায়ই সে কপালে বড় টিপ পরে, চুল ছোট রাখে এবং অতি অবশ্য তাকে দেখলে মনে হয়, ‘সে গোসল করে না’। আগে হয়তো ফেসবুকের ভিতরেই এই ট্যাগের প্রচলন ছিল। কিন্তু বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া স্ফিয়ারের সীমানা ছাড়িয়ে এই ট্যাগের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের জীবনের আরও অনেক ক্ষেত্রে। গত দেড় বছরে অজস্র মেয়ে অভিযোগ করেছেন যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তারা আশপাশ থেকে ‘শাহবাগী, শাহবাগী’ ফিসফাস শুনতে পেয়েছেন। অনেকে মুরুব্বিদের উপদেশ শুনেছেন। অনেকে ফেসবুকে কোন পোস্ট দিয়ে ‘শাহবাগী’ ট্যাগ অর্জন করেছেন। দিনে-দুপুরে মৌখিক হ্যারেসমেন্টের শিকার হওয়া নারীকেও শাহবাগী আখ্যা দিয়েছে এই দেশের ডানপন্থী নেটিজেনরা। হয়রানির দায়ে অভিযুক্ত পুরুষকে ফুলের মালা পর্যন্ত পরিয়েছে এই গোষ্ঠীর কিছু মানুষজন। এদের অনেকের কাছে ‘শাহবাগী’ বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ কোন ব্যাপার নয়। ইরান বা আফগানিস্তানে আন্দোলনরত নারীদেরও এরা সম্মোধন করে ‘ইরানের/আফগানিস্তানের শাহবাগী নারী’ হিসেবে।
ব্যাপারটা এখানেও সীমাবদ্ধ থাকেনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যেসব নারী শিক্ষার্থী বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য ঘটায় বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা তাদেরকেও ‘শাহবাগী’ আখ্যা দিয়ে তাদেরকে চুপ করিয়ে দিতে চেয়েছে। এর প্রধানতম উদাহরণ উমামা ফাতেমা। বা নুসরাত জাহান। বিভিন্ন সময়ে জামাত-বিরোধী বা ‘মবতন্ত্র’-বিরোধী মিছিলে অংশ নেওয়া নারীদেরকে ‘শাহবাগী’ আখ্যা দিয়ে অশ্লীল রসিকতার আসর বসেছে ফেসবুকে। সিপি গ্যাং-এর স্টাইলেই অনলাইনে সক্রিয় জামাতের বট-ফোর্স প্রতিপক্ষ নারীদের ব্যাপারে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার এমন এক সংস্কৃতি তৈরী করেছে যে ওই বট-ফোর্সের মোকাবিলা করার জন্য বাদবাকি দলগুলো পাল্টা বট-ফোর্স তৈরী করার চিন্তাভাবনা করছে। বলা বাহুল্য এই বট-ফোর্সের বৈশিষ্ট্য হলো এদের মন্তব্যে অশ্লীল গালাগালিই দেখতে পাওয়া যায় বেশি। এদের গালাগালি থেকে বামপন্থী, মধ্যপন্থী, সাবেক-ডানপন্থী, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী-কেউই মুক্তি পান না। কোন ইস্যুতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য হলেই অশ্লীল ট্যাগিং নিয়ে প্রতিপক্ষের উপর ঝাপিয়ে পড়ে এই বটবাহিনী। প্রতিপক্ষ যদি নারী হন তো তাকে সহ্য করতে হয় ‘শাহবাগী’, ‘বেশ্যা’-সহ অন্যান্য গালি যেগুলো বিশেষ করে নারীদের বেলায়ই ব্যবহৃত হয়।
প্রশ্ন ওঠে, এই ‘শাহবাগী নারী’-দের দোষ কী? ইসলামিস্টদের খায়েশ মোতাবেক চলাফেরা না করা? সত্য যে, বাংলাদেশে নারীদের হিজাব ও বোরকা-ব্যবহার নিয়ে নাগরিক মধ্যবিত্তের একাংশের মধ্যে এক ধরনের বিতৃষ্ণা আছে। সেই বিতৃষ্ণা কখনও কখনও ঘৃণায় পর্যবসিত হয়। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কিছু নারী বিভিন্ন ধরনের হয়রানিরও শিকার হয়েছেন এ কারণে। কিন্তু এর জন্য দায়ী কে/কারা? বাংলাদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল পরিমণ্ডলে সক্রিয় অনেক ব্যক্তিকেই হয়তো দায়ী করা যায় এর জন্য। কিন্তু ‘শাহবাগী নারী’-দের দোষ কী এক্ষেত্রে? এই নারীদের কতজন সতীর্থ কোন নারীর পোশাক-আশাক নিয়ে কটূক্তি করেছেন? এই নারীদের কয়জন ইসলাম-বিদ্বেষী? এই নারীরা কয়জন আদৌ ‘শাহবাগী’? তার চেয়ে বড় কথা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামার দরকার ছিল, তখন কি এই নারীরা ঘরে বসে ছিলেন?
প্রশ্নটা আরও সহজ করে করি- ‘শাহবাগী নারী’রা কি জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করে নাই? নির্যাতিত হয় নাই? জুলাই-উত্তর বাংলাদেশে কে জুলাইয়ের পক্ষে ছিল আর কে বিপক্ষে ছিল এইটা দিয়েই অনেক কিছুর ন্যায্যতা মাপা হচ্ছে। এই প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যাজনক। কিন্তু আপাতত অন্য একটা বিষয়ে মনোযোগ দিই আমরা-গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ও মালিকানা দখলের যে প্রতিযোগিতা দেখা গেছে, সেখানে নারীদের অবদান ঠিকমত উঠে এসেছে তো? জুলাইয়ে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা নির্বিশেষে রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন। তাদের মধ্যে হিজাব-পরা ধার্মিক নারী যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন অ-হিজাবি ও খোলামেলা পোশাক পরা নারীরাও। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নারী শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই আন্দোলন আদৌ সফল হতে পারতো কিনা সন্দেহ। এরপরও দেখা গেল জুলাইয়ের পরই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিস্ক্রিয় ও ব্যর্থ উপদেষ্টাদের ব্যঙ্গ করার জন্য তাদের শাড়ি-চুড়ি পরা কার্টুন তৈরী করা হলো। ইঙ্গিতটা এমন যে, এই উপদেষ্টারা কোন কাজ করেন না। কেবল শাড়ি-চুড়ি পরে মেয়েদের মতো ঘরে বসে থাকেন। কিন্তু আসলেই মেয়েরা ঘরে বসে থাকেন কি? ছিলেন কি? যদি না থাকেন তো এই সেক্সিস্ট, পুরুষবাদী কার্টুনের আইডিয়া আসে কীভাবে? জুলাইয়ের যে ইতিহাস আমরা লিখছি তা-ও কি এই ধরনের পুরুষবাদী ইতিহাস?
মুশকিল হলো গত দেড় বছরের বিভিন্ন ঘটনা থেকে এটা এখন প্রায় পরিষ্কার যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে একটি ‘ডানপন্থী’ ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করার প্রবণতা বাংলাদেশের ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ও অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে প্রবল। জুলাই-উত্তর বাংলাদেশে ডানপন্থী মবের দ্বারা সংঘটিত বিভিন্ন নৈরাজ্যের ঘটনার ন্যায্যতা খোঁজা হয়েছে জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের মধ্যে। জুলাইয়ের আন্দোলনকে ব্যবহার করে বামপন্থীদের বিরুদ্ধে ঘৃণাবাদী অ্যাক্টিভিজমের চর্চা হয়েছে সদর্পে। অথচ এই আন্দোলনের শরিক ছিল সবাই। এটা কোন একক গোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল না। কিন্তু সেই জুলাইয়ের পরেই যখন বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া ‘শাহবাগী’ মেয়েরা হেনস্থার শিকার হলো বা প্রতিবাদ করলো, তখন বাংলাদেশের ডানপন্থী নেটিজেনরা এমন অবলীলায় তাদের চরিত্রহননে নেমে পড়লো যে মনে হলো এই নারীরা আমাদের রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ নন বা আমাদের দেশেরই মানুষ নন। ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা হলের তালা ভেঙে বেরিয়ে না পড়লে হাসিনা-বিরোধী আন্দোলন হিসেবে জুলাইয়ের সূচনাই হতো না। কিন্তু আজ সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদেরকে উদ্দেশ্য করেই ডাকসু-কে ‘বেশ্যাখানা’ বলা হয়, আজ কোন মেয়ে রাতে হলের দরজা খোলা রাখার কথা বললে তাকে ‘শাহবাগী বেশ্যা’-য় পরিণত হতে হয়। জুলাইয়ের যে ইতিহাস আমাদের ডানপন্থী পুরুষেরা বুকে ধারণ করেন সেখানে এই ‘শাহবাগী নারী’দের স্থান কতটুকু, তা জানতে আসলেই খুব আগ্রহ হয়।
একাত্তরের ইতিহাস যে ঠিকমত লেখা হয়নি তার কারণ ওই ইতিহাস লেখার ও প্রচার করার কাজটি একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী, ‘প্রগতিশীল’, দেশপ্রেমিকগণ। রেহনুমা আহমেদ তার বইয়ে একাত্তরের এই ‘দেশপ্রেমিক ইতিহাস’-এর কঠোর সমালোচনা করেছিলেন এর অন্তর্গত পিতৃতান্ত্রিকতার কারণে। আজ আশঙ্কা হয় জুলাইয়ের যে ইতিহাস আমরা রেখে যাচ্ছি সেটাও হবে এক ধরনের এক তীব্র পিতৃতান্ত্রিক ইতিহাস, যেখানে সিগনেচার চরিত্র হিসেবে কিছু নারীর উল্লেখ হয়তো থাকবে ঠিকই কিন্তু গোটা নারী-সমাজের বিচিত্র ও ব্যাপক অংশগ্রহণের বর্ণনা যেখানে থাকবে না। বা থাকলেও এমনভাবে থাকবে যেন ওটা ছাড়াও যা কিছু ঘটেছে, তা সত্যি সত্যিই সম্ভব ছিল। ইতিহাসের ওপর যে ‘দেশপ্রেমিক, ডানপন্থী দখলদারিত্ব’ স্থাপনের প্রচেষ্টা চলছে তাতে আসলে আশঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। আসলে আমরা জাতি হিসেবে কতোটা অকৃতজ্ঞ ও পুরুষবাদী তা বোঝা যায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ঘটনার অপরিহার্য অংশ নারীদের সাথে আমরা যে আচরণ করেছি, সেটা দেখলে। রেহনুমা আহমেদের বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়েই শেষ করি:
“পিতৃতন্ত্রের অবিরাম বিজয় জ্বলজ্বলভাবে সবার কাছেই স্পষ্ট, বেশ্যা হচ্ছে যাকে বলে সবকিছুকে-ধারণ-করা-যায় এমনই একটি ‘হোল্ডঅল’ সমাধান: আমরা ধর্ষিত নারীদের ফেরৎ নিতে চাই না, কী করব? তাদের বেশ্যা ঘোষণা কর। আমরা একটি কিশোরীকে গণধর্ষণ করে হত্যা করেছি কিন্তু আমরা শাস্তি দিতে চাই না, কী করি, বলো তো? একটি সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলো, ও বেশ্যা। আমরা এই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পছন্দ করি না যারা সরকারের সমালোচনা করে, ওদের মধ্যে কেউ-কেউ বিএনপি-জামায়াতকে সমর্থন করে, অন্যরা স্বতন্ত্র, কী করব? ওদের ছবি পোস্টারে ছাপো, বেশ্যা ডাকো। একজন নারী আক্টিভিস্ট আছে, শ্রমিক অধিকারের জন্য লাগাতার লড়াই করে যাচ্ছে, আমরা ঝাক পছন্দ করি না, কী করব? বেশ্যা ডেকে মাইর দাও। আমাদের শালিসে বসতে হবে, মেয়েটিকে উত্যক্ত করার পর তুলে নিয়ে যায় এখন আবার তাকে পাওয়া গেছে, কী করি বলো তো? বেশ্যা ডাকো। আচ্ছা, ওই মেয়েটি তো কুমারিত্ব হারালো আমরা ওকে ধর্ষণ করেছি বলে, কী করব? অভিধান ম্যানেজ করো, বলো, যে নারী ধর্ষিত, সে বেশ্যা।”
এই মুহূর্তে আমি বসে আছি টিএসসির এক চায়ের দোকানে। বসে বসে রাজু ভাস্কর্যে জামাতের নেতার বক্তব্যের বিরুদ্ধে ডাকা মেয়েদের প্রোগ্রাম দেখছি। একই সাথে দেখছি একই প্রোগ্রামের ফেসবুক লাইভ, যেখানে ‘শাহবাগী’ গালির রীতিমতো বন্যা বয়ে যাচ্ছে। জুলাই-উত্তর বাংলাদেশের বাস্তবতা বোঝার জন্য আপনি উপরোক্ত উদ্ধৃতিতে ‘বেশ্যা’-র জায়গায় ‘শাহবাগী’ বসিয়ে নিতে পারেন।
