আমাদের সমাজে নারীর নিরাপত্তা যতটা না আইন নির্ধারণ করে, এরচেয়ে বহু গুণ বেশি নির্ধারণ করে সমাজের ভাষা। কারণ ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা এক ধরনের ক্ষমতা। এই ভাষাই ঠিক করে দেয় নারীকে আমরা মানুষ হিসেবে দেখবো, নাকি পুরুষের অধীন কোন সম্পত্তি-সম্পর্ক আর মালিকানার অংশ হিসেবে ভাববো। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি যেমন ভাষা তৈরি করে, তেমনি ভাষাও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। তাই প্রতিদিনের কথায়, হাস্যরসে, মন্তব্যে বা কটুক্তিতে আমরা নারীকে ব্যক্তি মানুষ হিসেবে নয়—“কারও বউ”, “কারও সম্পত্তি”, “কারও দায়িত্ব” বলে সম্পর্কের ট্যাগ লাগিয়ে দেখি।
হাদির স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পাকে নিয়ে যে ভাষাগত সহিংসতা চালানো হয়েছে ফেসবুক পোস্টে তা যে কোন ব্যক্তিগত পারিবারিক বিবাদ নয় বরং পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির নগ্ন প্রকাশ, এটা আমরা সবাই জানি। ওসমান হাদির মেজো ভাই শরীফ ওমরের পোস্টে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে- “হাদির যা ছিল সব নিয়ে নেও, এমনকি তার বউকে নিয়ে নেও…”। এর মানে কী? শম্পা কি কারও কোন মালপত্র বা সম্পত্তি যাকে ইচ্ছে করলে “নেওয়া” যায়, “দেওয়া” যায় বা ভাগ-বাটোয়ারা করা যায়?
শরীফ ওমর শুধু রাবেয়া ইসলাম শম্পাকে অপমান করেই ক্ষান্ত হননি; তিনি অবলীলায় হাদির সন্তানকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে যাওয়ার কথাও বললেন। তার দাবি সন্তানটি তার বা তার পরিবারের, শম্পার নয়। অথচ হাদির সন্তানের ওপর স্ত্রী শম্পার হক ও অধিকারই সবচেয়ে বেশি। তার চেয়ে বেশি অধিকার আর কারও থাকতে পারে না। যদিও শম্পা এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে, তবু বাস্তবতা হলো শেষ পর্যন্ত শম্পা এই অধিকার আদৌ অটুট রাখতে পারবেন কি না আমরা সত্যিই নিশ্চিত নই।
এই দৃশ্য আমাদের সমাজে খুব পরিচিত। পরিবারের কোন ছেলে মারা গেলে তার স্ত্রীর জীবন ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। অনেক সময় সন্তানসহ তাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, সম্পত্তি থেকে বিতাড়িত করা হয়, বিশেষ করে যদি সেই নারীর সন্তান কন্যাশিশু হয়। আবার কখনও সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাবে এই আশঙ্কায় মৃত ব্যক্তির জীবিত বড় বা ছোট ভাইয়ের সঙ্গে তাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত নারীটির নিজের সিদ্ধান্তের কোন জায়গাই রাখা হয় না।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নারীর ব্যক্তিসত্তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা। রাবেয়া ইসলাম শম্পার ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই হয়েছে। সংবাদে বারবার “হাদির স্ত্রী” পরিচয়টি সামনে এসেছে। কিন্তু হাদির স্ত্রীর মধ্যে লুকিয়ে রাখা নারীটির নিজস্ব পরিচয়টুকু মিডিয়া তুলে ধরেনি, প্রয়োজনও মনে করেনি। বরং “হাদির স্ত্রী” পরিচয়ে সংবাদ প্রকাশ করে বিষয়টিকে আরও হালকা ও sensational করে তুলেছে। অথচ হাদির স্ত্রীর একটি স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে, যার নাম রাবেয়া ইসলাম শম্পা। ফলে দর্শক-পাঠকের চোখে তিনি কেবল একজন নারী, ব্যক্তি মানুষ হিসেবে নয় এবং একজন পুরুষের ‘সম্পর্কিত’ মানুষ হিসেবেই পরিচিত হোন। এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। নাম মুছে গেলে মানুষও মুছে যায়। আর পরিচয় চাপা পড়লে অধিকার নিয়ে কথা বলাটাও কঠিন হয়ে যায়।
দুঃখজনক হলেও সত্য হাদির অসংখ্য অনুসারীর বড় একটি অংশ এই ঘটনায় তেমন কোন প্রতিবাদ দেখায়নি। ন্যায়-ইনসাফের কথা বলা অনেকের কাছেই নারীর অপমান ‘ব্যক্তিগত ব্যাপার’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রতিবাদ একেবারে হয়নি, এমনও নয়। অনেক প্রগতিশীল ও নারীবাদী ব্যক্তিত্ব এই ঘটনার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো হাদির অনুসারীদের একাংশ সেই প্রতিবাদীদের “শাহবাগী”, “এজেন্ট”, “ফিতনা”, “বেপর্দা”—এমন নানা ট্যাগ দিয়ে অতীতে আক্রমণ করেছে বিভিন্ন সময়।
এই জায়গায় এসে নারীবাদকে গালি দিয়ে কেউ নৈতিক দায় থেকে মুক্তি পেতে পারে না। বরং সত্যটা হলো যারা হাদিকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করেন, এমন অনেক নারীবাদী ব্যক্তিত্বও এই কটূক্তির প্রতিবাদ করেছেন। কারণ নারীবাদ ব্যক্তিপূজা নয়, নারীবাদ ন্যায্যতার রাজনীতি। নারীবাদ বলে কোন নারীকে অপমান করা যাবে না, তাকে সম্পত্তি বানানো যাবে না, তার সন্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যাবে না, বিবাহ বিচ্ছেদ কিংবা স্বামীর মৃত্যুর পর নারীর সন্তানকে কেড়ে নেওয়া যাবে না। সে নারী কে, কোন ধর্মীয় পরিচয়ে আছে, কোন মতাদর্শে আছে—এগুলো শর্ত হতে পারে না। এবং এখানে আরেকটি কথা স্পষ্টভাবে বলতে হয়-ধর্মকে নারী-বিদ্বেষের হাতিয়ার বানিয়ে যারা পুরুষতন্ত্রকে জায়েজ করে তারা ধর্ম রক্ষা করছে না, তারা ক্ষমতা রক্ষা করছে। পবিত্র কুরআনের প্রথম শব্দ “ইকরা”—পড়ো। না পড়ে, না বুঝে, অন্যের শেখানো বুলি আওড়ে নারীর অধিকারকে ছোট করা ধর্ম হতে পারে না। সত্যিকারের ধর্ম মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। ন্যায়বোধ শেখায়। কারও সম্মান কেড়ে নেওয়ার আনন্দ শেখায় না।
যে হাদিকে ‘আধিপত্যবাদ-বিরোধী’ ও’ ইনসাফ’-এর পক্ষে লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হচ্ছে, সেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটাই কি নারীর ক্ষেত্রে এসে থেমে যায়? আধিপত্য তো কেবল রাষ্ট্র বা ক্ষমতার কাঠামোয় নয়- আধিপত্য পরিবারে, সম্পর্কে, ভাষায় এবং সবচেয়ে বেশি নারীর প্রাত্যহিক জীবনে কাজ করে। একজন নারীকে যখন ব্যক্তি হিসেবে নয়, সম্পত্তি বা মালামাল হিসেবে বিবেচনা করে তার বিরুদ্ধে কুৎসিত ভাষা ছোড়া হয়, তার অধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়–সেটাও আধিপত্যই। তাই ‘আধিপত্যবাদ-বিরোধিতা’ যদি সত্যিই নৈতিক অবস্থান হয়, তবে নারীর ওপর আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই ব্যক্তির প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হওয়ার কথা। নইলে সমাজে ন্যায্যতা আসবে না, সমাজে ‘ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠিত হবে না।
