শনিবার, মে ১৬, ২০২৬
Homeনারীবাদনিরানব্বই শতাংশের নারীবাদঃ মানুষের অধিকার আদায় আর প্রাণ ও প্রকৃতি...

নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদঃ মানুষের অধিকার আদায় আর প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষার এক নয়া আন্দোলন

“নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদ’ এই শব্দবন্ধটি নেয়া হয়েছে সিনজিয়া আরুজ্জা, তিথী ভট্টাচার্য ও ন্যান্সি ফ্রসার এর লেখা ইশতেহার ধরনের পুস্তক “Feminism for the 99%: A Manifesto” থেকে। এই পুরো পুস্তকটিতে মূলত বামপন্থী ও সমাজতন্ত্রী নারীবাদীদের ইশতেহারমূলক প্রস্তাবনাগুলোকেই হাজির করা হয়েছে। ইশতেহারটিতে এই ত্রয়ী বামপন্থী নারীবাদী বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমজীবী আটপৌরে নারীর মুক্তির রাজনীতি ও কর্মকৌশল ব্যাখ্যা করেছেন। আমি বইটি পড়েছি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতকে মাথায় রেখে। কেন এই ত্রয়ী নারীবাদীর প্রস্তাবনা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে দারুন প্রাসঙ্গিক এবং বাংলাদেশের নারীবাদীরা কেন এই প্রস্তাবনার সাথে যুক্ত হতে পারেন, সেই প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই এই লেখা। এই লেখাটি তাদের পুস্তকের সরাসরি অনুবাদ নয়, বরং তাদের গড়ে তোলা রাজনৈতিক বয়ানের উপরে ভিত্তি করে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে একটি বোঝাপড়া হাজির করতে চাওয়ার চেষ্টা। লেখাটির কংকাল এই ত্রয়ী নারীবাদী লেখকের রাজনৈতিক প্রস্তাবনা থেকে নেয়া। কিন্তু এর শরীরে আরও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ যুক্ত করা হয়েছে বিষয়গুলোকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলার জন্যে, যুক্ত করা হয়েছে বাংলাদেশের নারীর প্রেক্ষিত। ‘নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদ’ আসলে কী, কেন তা জরুরী এবং কেনই বা মোটের উপরে সেটাই নারীর অধিকার আদায়ের, নারীর মুক্তি সংগ্রামে সাফল্য অর্জনের অধিকতর মোক্ষম পথ এসব ব্যাখ্যা করাই এই বইয়ের উদ্দেশ্য।

‘নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদ’  বা ‘Feminism for 99%’ এই বর্গটি সাম্প্রতিক সময়ে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এ এক নতুন নারীবাদ। এই নারীবাদ কী? কারা এই পরিচয়ের নারীবাদী? কী তাদের রাজনৈতিক আলাপ – এজেন্ডা? এই ধরনের নানান প্রসঙ্গে পশ্চিমে আলোচনা, বিতর্ক ও সমালোচনা শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। কিন্তু বাংলা ভাষায়, বিশেষত বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই গনমানুষের নারীবাদ নিয়ে এখনও খুব গোছানো আলাপের শুরু হয়নি। যদিও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের অধীনে সাধারণ খেটে খাওয়া নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম বাংলাদেশে জারী রয়েছে বহু বছর ধরে। এখনও বেশ কয়েকটি প্রধান বাম ও ডানপন্থী রাজনৈতিক দল খেটে খাওয়া নারীদের মাঝে সাংগঠনিক তৎপরতা জারী রেখেছে। কিন্তু নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই বিরাট অংশের নারীদের মুক্তিসংগ্রামের সাংগঠনিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সংগ্রামের তত্ত্ব রচনার কাজটি খুব প্রকাশ্য নয়। হয়তো বিদ্যায়তনিক চত্বরে এই বিষয়ে একাডেমিক আলাপ হয়েছে কিন্তু খুব প্রকাশ্য সক্রিয়তাবাদের ধারায় তা এখনও অনুপস্থিত। এই লেখাটি বাংলা ভাষায় ‘নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদ’ প্রসঙ্গটিকে আলোচনায় নিয়ে আসতে চায়।

নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদ মূলত তৃনমূল প্রান্তিক নারীদের নারীবাদ। কিন্তু এই মতবাদের প্রবক্তাগন হচ্ছেন শহরে বসবাসকারী নারীবাদী, এদের অনেকেই পেশাগত ভাবে বিদ্যায়তনিক চত্বরের অধিবাসী। কিন্তু এঁরা কেন শহুরে মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তৃনমূল, প্রান্তিক নারীদের নারীবাদ নিয়ে আলাপ তুলছেন? এর সহজ উত্তর হচ্ছে, এঁরা মনে করেন ‘শহুরে নারীবাদ’ ব্যর্থ হয়েছে, এখন দরকার সেই নারীবাদ যা প্রবনতাগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং শহুরে মধ্যবিত্তের আরামদায়ক চত্বর পেরিয়ে সাধারণ মানুষের চত্বরে গিয়ে হাজির হবে।তাই এই নারীবাদীরা এক ধরনের সমকালীন বোঝাপড়ার উপরে ভিত্তি করে প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে, তাদের অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে এক ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈপ্লবিক নারীবাদের কথা বলছেন। এই নারীবাদের ছাতার নীচে এঁরা সেই সকল নারীদের নিয়ে আসার কথা বলছেন, যারা ইতিহাসে প্রায় সকল ধারার নারীবাদীদের দ্বারাই এক রকমের উপেক্ষিতই থেকে গেছেন। কয়েকজন প্রখ্যাত নারীবাদী সক্রিয়তাবাদীর হাত ধরে প্রথম এই নারীবাদের তাত্ত্বিক আলাপ প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, ‘ভিউপয়েন্ট’ পত্রিকায়। এই নারীবাদী রাজনৈতিক অবস্থানকে দাবী করা হচ্ছে এযাবৎ কালের নারীবাদের প্রধান সবকয়টি ধারার সমষ্টি। অর্থাৎ এই নারীবাদ র‍্যাডিক্যাল নারীবাদ, মার্কসবাদী, সমাজতন্ত্রী নারীবাদ ও ব্ল্যাক ফেমিনিজমকে একইসাথে ধারণ করতে পারে বলে দাবী করেছে।

এই নতুন ধারার নারীবাদের তাত্ত্বিক রচনার শুরুটা হয় ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে আমেরিকার নারী অধিকারকর্মীদের এক সর্বাত্মক প্রতিবাদ মিছিল থেকে। পরবর্তীতে এই প্রতিবাদ মিছিলকে অনেকেই নাম দিয়েছেন “দ্যা উওমেন মার্চ”। গত ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসের একুশ তারিখে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এর ক্ষমতায় অভিষেকের প্রতিবাদে আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন শহরে নারী অধিকার সক্রিয়তাকর্মীগণ একই সাথে প্রতিবাদ মিছিলে শামিল হয়েছিলেন। সবচাইতে বড় প্রতিবাদ মিছিলটি জড়ো হয়েছিল মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ওয়াশিংটন ডিসি শহরে এবং এই মিছিলের নাম দেয়া হয়েছিল “ওয়াশিংটন মার্চ”। এই একটি মিছিলেই জড়ো হয়েছিলেন প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। আমেরিকার নারী অধিকারের ইতিহাসে একদিনের প্রতিবাদ মিছিলে সমবেত মানুষের সংখ্যা এটাই সর্বাধিক। ডোনাল্ড ট্রাম্প এর মতো একজন চরম লিঙ্গবৈষম্যবাদী রাজনীতিবিদের অভিষেককে আমেরিকার নারীর জন্যে, তাদের অধিকারের সংগ্রামের জন্যে চরম এক বিপদ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন আমেরিকার লক্ষ লক্ষ নারী অধিকার সচেতন মানুষেরা। এই কর্মসূচীর সাথে সংহতি জানিয়ে আমেরিকায় মোট ৪০৮টি প্রতিবাদ মিছিল সংগঠিত হয়েছিল সেদিন এবং আরও ৮১টি দেশের ১৬৮টি শহরে একই ধরনের প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এই সকল প্রতিবাদ মিছিল তাই শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প এর মতো চরম বর্ণবিদ্বেষী রাজনীতিবিদের উত্থানের ভয়ংকর দিকগুলো নিয়েই প্রতিবাদ করেনি, সেই সাথে সারা পৃথিবীতেই নারীর অধিকারের স্বপক্ষে আইন সংস্কার, নতুন আইনের প্রবর্তন ও সকল লিঙ্গবৈষম্যবাদী আইনসমূহ বাতিলের দাবী জানিয়েছিল।

“ওয়াশিংটন মার্চ” সংগঠিত হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি ছিল সারা দুনিয়ার নারীবাদীদের জন্যে এক দারুণ শিক্ষা। কতটা ন্যূনতম ঐক্যের ভিত্তিতে সারা দুনিয়ার নারীবাদীগণ এক যায়গায় মিলিত হতে পারেন এই আন্দোলন সেই শিক্ষা দিয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প এর এই অবিশ্বাস্য উত্থানে আমেরিকার আরও লক্ষ নাগরিকের মতোই একই রকমের হতাশ ও স্তব্ধ হয়েছিলেন ইন্ডিয়ানা রাজ্যের অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী থেরেসা শুক। প্রবল ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকেই তিনি ফেইসবুকে একটি ‘ইভেন্ট পেইজ’ খোলেন কিছু কাছের বন্ধুদের প্রতি আহবান জানানোর জন্যে যে ওয়াশিংটন গিয়ে এই ঘটনার প্রতিবাদে শামিল হবার জন্যে। এর পরপরই একই ধরনের ফেইসবুক পাতা খোলেন এভি হারমোন (Evvie Harmon), ফণতানে পিয়ারসন (Fontaine Pearson), বব ব্লান্দ (Bob Bland), ব্রিয়ান বাটলার (Breanne Butler) এবং আরও অজস্র নারীবাদী ও নারী অধিকার কর্মীগণ। কয়েক দিনের মধ্যেই এই বিশেষ প্রতিবাদটি সারা আমেরিকা জুড়ে একটি জাতীয় প্রতিবাদ কর্মসূচীতে রূপলাভ করে।

এই আন্দোলনের কতগুলো বৈশিষ্ট্য রাজনৈতিক মহলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। প্রথমত একটি “ফেইসবুক ইভেন্ট” থেকে কীভাবে সারা দুনিয়াব্যাপী প্রায় দশ – বারো লক্ষ নারীর প্রতিবাদ গড়ে উঠতে পারে, সেই সংগঠন পদ্ধতিটি ছিল দারুণ বিস্ময়কর। “ওয়াশিংটন মার্চ” এর সংগঠন-পর্বেই নানান পেশাগত দক্ষতার নারীরা এসে জড়ো হতে থাকেন এই প্রতিবাদে। এরা শুধু নিজেদের প্রতিবাদ জানাতেই শামিল হলেন তা নয়, বরং এই আন্দোলনের জন্যে নিজেদের দক্ষতাকেও ভাগ করে নিতে শামিল হলেন। এই আন্দোলনে শামিল হলেন একদল ‘লজিস্টিকস ও সাপ্লাইচেইন বিশেষজ্ঞ’ নারী, এরা আন্দোলনের কাঠামোগত সংগঠন বা লজিস্টিকস এর দায়িত্ব নিলেন। জড়ো হলেন সাংবাদিক, প্রচার বিশেষজ্ঞ, বিপণন বিশেষজ্ঞ, চিত্র নির্মাতা, ডাক্তার, নার্সসহ আরও অজস্র পেশার মানুষেরা এবং তাঁরা তাদের নিজেদের দক্ষতা অনুযায়ী সমগ্র আন্দোলনটির মাঠ পর্যায়ের যাবতীয় দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিলেন। অর্থাৎ একটি বিপুল প্রতিবাদ কর্মসূচীতে নারী শুধু নিজে অংশগ্রহণকারীই নন, বরং প্রতিটি নারী হয়ে উঠেছিলেন একেকজন দক্ষ সংগঠকও। সম্ভবত এই প্রথম এতো বিশাল একটি আন্দোলন গড়ে উঠলো নিরেট এর অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের দক্ষতায়, কোন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির আয়োজনে নয়। আরও একটি বিশেষ দিক এই আন্দোলনের অংশ হয়ে ছিল। এই প্রতিবাদ কর্মসূচী প্রায় সকল শ্রেণী, পেশা, ধর্ম, বর্ণ ও জাতীয়তার নারীকে এক যায়গায় জড়ো করতে পেরেছিলএই প্রতিবাদ কর্মসূচীতে যেমন ধার্মিক মানুষ যুক্ত হয়েছিলেন তেমনি যুক্ত হয়েছিলেন সেক্যুলার এবং অবিশ্বাসী মানুষেরাও। এই আন্দোলন থেকে যেমন আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমা দুনিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের প্রতি নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ করা হয়েছে, ঠিক একইভাবে সারা পশ্চিমা দুনিয়ায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপরে চলমান বৈষম্যবাদেরও প্রতিবাদ করা হয়েছিল। পশ্চিমে, সারা ইউরোপ জুড়ে এবং বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী জনগণের প্রতি যে তীব্র ঘৃণাবাদের উত্থান ঘটেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, নারীদের এই মিছিল সেই ঘৃণাবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ হাজির করেছিল। অর্থাৎ এই প্রতিবাদ মিছিলটি নারীবাদীদের হাতে সংগঠিত হলেও এর এজেন্ডা বা রাজনৈতিক প্রকল্প ছিল মানুষের মুক্তির প্রসঙ্গে। এই প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং সারা দুনিয়ার নানান ঘরানার নারীবাদী সক্রিয়তাকর্মীগণ। নারীবাদের তাত্ত্বিক বিভিন্ন প্রশ্নে নিজেদের মতামতের ভিন্নতাকে পাশে তুলে রেখে শুধুমাত্র মানুষের অধিকার সংরক্ষণের প্রশ্নে, বিশেষত নারীর অধিকার সংরক্ষণের প্রশ্নে সকল মতভেদ ভুলে নারীবাদীরা একসাথে জড়ো হয়েছিলেন। “ওয়াশিংটন মার্চ” আন্তর্জাতিক নারীবাদীদের সামনে এই সম্ভাবনাটি নিয়ে এসেছিল যে নারীর অধিকারের প্রশ্নে, মানুষের অধিকারের প্রশ্নে সকল তাত্ত্বিক ভিন্নতা ভুলে একত্রিত হওয়া যায় এবং একই প্রতিবাদে শামিল হওয়া যায়। নারী সক্রিয়তাবাদীদের এই ঐক্য নারীবাদীদের গভীরভাবে উৎসাহী করে তোলে একটি দীর্ঘমেয়াদী ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের সম্ভাবনার বিষয়ে।

নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদ সুনির্দিষ্টভাবেই আজকের নয়া উদারনীতিবাদী পুঁজিবাদের বিরোধী। এই নারীবাদ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চায়, এই ব্যবস্থার উৎপাটন ব্যতীত নারীর জন্যে একটি লৈঙ্গিক সমতার সমাজ তৈরি করা যাবে না বলেই মনে করে। সুতরাং রাজনৈতিকভাবে যে সকল মানুষ ও নারীবাদীগণ পুঁজিবাদের পক্ষের তাদের জন্যে নিরানব্বই শতাংশের নারীদের রাজনৈতিক প্রস্তাবনার সাথে একমত হওয়া কঠিন। কিন্তু এই নতুন নারীবাদ এই সকল সক্রিয়তাবাদীদেরকেও পাশে পেতে চায়। সেজন্যেই এই নারীবাদ মোট এগারোটি প্রস্তাবনার মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক তাত্ত্বিক অবস্থানকে ঘোষণা করেছে। এই এগারোটি তাত্ত্বিক প্রস্তাবনার প্রথম দুটি প্রস্তাবনায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে নারীবাদী সংগ্রামের ঐতিহ্যকে এবং হাজির করা হয়েছে লিবারাল ফেমিনিজমের ফ্যাশনদুরস্ত শহুরে মধ্যবিত্তের নারীবাদের বিপরীতে শ্রমজীবী নারীদের সক্রিয় সংগ্রাম যা সাম্প্রতিক সময়ে নারীবাদী ধর্মঘটের আদলে আবারও হাজির হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। ঘরে ও কর্মস্থলে নারীর সর্বাত্মক ধর্মঘট পশ্চিমা বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে নারীর ভূমিকাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে নারীদের ঘরে ও বাইরে সর্বাত্মক ধর্মঘট এই নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদকে প্রেরণা যুগিয়েছে। নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদী তাত্ত্বিকেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার এই ধর্মঘটী নারীবাদীরা সংগ্রামের ঐতিহ্য হিসাবে ধর্মঘটকে ফিরিয়ে এনেছেন বটে। কিন্তু সমগ্র ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক সমাজ ভুলে গেছে যে এই ধর্মঘটের ঐতিহ্য মূলত শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের ঐতিহ্য, কারখানা শ্রমিকের ধর্মঘটের ইতিহাস থেকেই এসেছে। তাই নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদের গোড়ার কথা হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামকে এবং সেই সংগ্রামের ইতিহাসকে আবারও আলোচনায় নিয়ে আসতে হবে। সেটাই হওয়া দরকার এই নতুন আন্দোলনের সূচনা বিন্দু। বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহন বেড়েছে গত কয়েক দশকে, কিন্তু সেই সাথে বেড়েছে নারীর প্রতি বৈষম্যবাদী আচরণ। বৈষম্যমূলক মজুরী, অনিরাপদ কর্মস্থল, নারীর প্রতি কর্মস্থলে যৌন হয়রানির মতো চরম অমানবিক ঘটনাগুলোর সংখ্যা ও আশংকা বেড়েছে বহুগুন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের বাংলাদেশের আজকের নারীবাদ সেই সকল শ্রমজীবী মানুষের কথা বলছে না, অথবা এই বলে উঠতে পারাকে জরুরী মনে করছে না। নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদ এই বিষয়টিকে একটি প্রধান এজেন্ডা হিসাবে হাজির করেছে।

প্রস্তাবনা তিন ও চার হচ্ছে মূলত খুব সংক্ষেপে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুঁজিবাদের স্বরূপ অনুসন্ধান করা। নারীর অধিকার বঞ্চিত হবার ইতিহাসের সাথে কীভাবে পুঁজিবাদ সম্পৃক্ত সেই আলাপটিকে সামনে নিয়ে এসেছে এই দুই প্রস্তাবনা। একথা সত্যি যে মানুষের ইতিহাসে নারীর পদানত হবার ঘটনার শুরুটা অনেক পুরনো। সেই তুলনায় পুঁজিবাদের ইতিহাস খুবই সাম্প্রতিক, মাত্র কয়েক’শ বছরের পুরনো এই ব্যবস্থা কেন নারীর মুক্তির প্রধান শত্রু হয়ে উঠলো সেটাই ব্যাখ্যা করা হয়েছে এই দুই প্রস্তাবনায়। পিতৃতন্ত্রের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের আর আধুনিক পুঁজিবাদের শুরু হয়েছিল মাত্র আঠারো শতকের শেষ ভাগ থেকে। কিন্তু পুঁজিবাদ তার বড় হয়ে ওঠার, বিকশিত হয়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে কীভাবে আদিম পিতৃতন্ত্রের সাথে গাঁটছড়া বেধেছে পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে – কখনো এর সাথে একাট্টা হয়ে আবার কখনো বা প্রয়োজনবোধে পিতৃতন্ত্রের সাথে দর কষাকষি করে, সেই প্রসঙ্গটি জানা জরুরী। পুঁজিবাদ অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক শক্তি হলেও এটাই হয়ে উঠেছে পিতৃতন্ত্রের সবচাইতে বড়ো রক্ষক ও লালন কর্তা। তাই আধুনিক পুঁজিবাদের স্বরূপ না বুঝে নারীর মুক্তি তথা মানুষের মুক্তির সংগ্রাম করা কেবল পণ্ডশ্রম মাত্র। আর সাম্প্রতিক দশকে পুঁজিবাদের নয়া উদারনীতিবাদী রূপান্তর কীভাবে সরাসরি নারীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সেই প্রসঙ্গটিও খুব সংক্ষেপে আলাপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি কীভাবে পুঁজিবাদ, প্রথাগত পিতৃতান্ত্রিক পরিবার, ধর্মবিশ্বাস সকলেই একাট্টা হয়ে গড়ে তুলেছে এক অদ্ভুত সংস্কৃতি যার একটি প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে নারীর প্রতি পিতৃতান্ত্রিক বৈষম্যবাদী প্রথাগুলোকে, নারীর প্রতি পুঁজিবাদী শোষণকে জায়েজ করে নেয়া, সমাজ স্বীকৃত করে নেয়া। নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদ তাই পুঁজিবাদ – প্রথাগত পিতৃতন্ত্র আর সংখ্যা গরিষ্ঠের ধর্মবিশ্বাসের এই নারীবিদ্বেষী এলায়েন্স বা ঐক্যকে শ্রমজীবী নারীর সামনে ব্যাখ্যা করতে চায়। শ্রমজীবী নারীকে এই দুষ্ট চক্র ভাঙ্গার সংগ্রামে শামিল করতে চায়।

পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম প্রস্তাবনা-ত্রয়ীর মধ্যে দিয়ে খানিকটা জটিল প্রসঙ্গ হাজির করা হয়েছে। এই তিন প্রস্তাবনার মাঝে আলাপ করার চেষ্টা করা হয়েছে পুঁজিবাদ, লিঙ্গ ও যৌনতার প্রসঙ্গকে। আজকের পুঁজিবাদকে সাধারণ অর্থে লৈঙ্গিক বৈষম্যবাদের বিরোধী মনে হলেও পুঁজিবাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বরূপ এখনও লৈঙ্গিক বৈষম্যবাদের ধারক ও রক্ষক। সেজন্যে পুঁজিবাদ তার ব্যবস্থার মধ্যে নারী-পুরুষ শ্রমিকের মজুরী বৈষম্য নিয়ে খুব বড়ো সড়ো আলাপ তুলতে চায় না। পুঁজিবাদের রাজধানী খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মাঝে মজুরী বৈষম্য আজও, এই ২০২৬ সালেও প্রকট এবং প্রকাশ্য। এমনকি চরম নারীবান্ধব দাবী করা উত্তর মেরুর দেশগুলোতেও একই কাজের জন্যে একই যোগ্যতাসম্পন্ন নারী ও পুরুষের মজুরী-সাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে আজকের পুঁজিবাদ ও তার সংস্কৃতিকে আপাতভাবে মানুষের স্বাধীন যৌনতার সমর্থক মনে হলেও বাস্তবতা হচ্ছে পুঁজিবাদ ঠিক ততটুকুই মানুষের স্বাধীন যৌনতার কর্তাসত্ত্বাকে স্বীকার করে, যতটুকু স্বীকার করলে তার গায়ে কোন আঁচড় পড়ে না। পুঁজিবাদ মানুষের যৌনতাকে উন্মুক্ত করে দিতে চায় এবং একই সাথে মানুষের যৌনতাকেও পণ্যে রূপান্তরিত করে।  মানুষের স্বাধীন যৌনতার কর্তাসত্ত্বাকে সে ‘চয়েস’ হিসাবে হাজির করে আর সেই চয়েস এর উপড়ে ভিত্তি করে গড়ে তোলে বিলিয়ন ডলারের পর্ণগ্রাফি ও বাণিজ্যিক যৌনতার শিল্প। আজকের নয়া উদারনীতিবাদী পুঁজিবাদের সমর্থক লিবারাল ফেমিনিজমের নানান শাখা প্রশাখায় বিভাজিত নারীবাদীগন পুঁজিবাদের এই আয়োজনের সাথে নিজেদের সমর্থনকে শামিল করে নিয়েছেন ‘চয়েস ফেমিনিজম’ এর নামে। বাস্তবতা হচ্ছে পর্ণগ্রাফি নির্মিত হয় নারীর মনুষ্য সত্ত্বাকে অস্বীকার করে, পুরুষের যৌনতাকে হাসিল করার জন্যে। এখানে পুরুষ খরিদ্দার ও সিদ্ধান্তদাতা, নারীর শরীর কেবল সেই খরিদ্দারের চাহিদা (Customer need)  অনুযায়ী ভোগ্যপণ্য উৎপাদন করে। পুঁজিবাদ সেই ভোগ্যপণ্যকে বাজারে তোলে ও বিক্রি করে এবং এর নাম দেয় ‘যৌনতার স্বাধীনতা’। নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদীরা যৌনতার স্বাধীনতার এই ধরনের সংজ্ঞায়নকে অস্বীকার করে এবং এর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, যা অন্তর্গতভাবেই যৌনতার প্রশ্নে নারীর কর্তাসত্ত্বার অবদমন, বন্দিত্ব। মানুষের যৌনতার স্বাধীনতার প্রসঙ্গে পুঁজিবাদের সমর্থক নারীবাদীগণ আধুনিকতাবাদী অবস্থান নিয়ে থাকেন। অর্থাৎ এঁরা শুধু নারী ও পুরুষের যৌনতার কথা বলেন তা নয়, সাম্প্রতিক সময়ে এরা মিশ্রযৌন পরিচয়ের মানুষের যৌনতার অধিকারের স্বপক্ষেও কথা বলেন। কিন্তু পুঁজিবাদের সমর্থক ও আধুনিকতাবাদী এই সকল নারীবাদীগণ মিশ্র যৌনতার মানুষের অধিকার নিয়ে সেইটুকুই আওয়াজ তোলেন যতটুকু বিদ্যমান রাষ্ট্র অনুমোদন করে থাকে। অর্থাৎ মিশ্রযৌনতার মানুষদের জন্যে এদের পক্ষপাত হচ্ছে রাষ্ট্রের অনুকূল, অর্থাৎ রাষ্ট্র যেটুকু অধিকার দিতে চায় বা দিতে ‘পারে’ সেটুকুর জন্যেই এঁরা কথা বলে থাকেন। পৃথিবীর দেশে দেশে মিশ্র যৌনতার মানুষদের নিরাপত্তা ও অধিকার সংরক্ষণের জন্যে নানান ধরনের আইন তৈরি হলেও বেশীরভাগ রাষ্ট্রেই এঁদের স্বাস্থ্যগত অধিকারের স্বপক্ষে আইন গড়ে ওঠেনি। ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের কাঙ্ক্ষিত যৌন পরিচয়ের পক্ষে দরকারী স্বাস্থ্যগত পরিবর্তনের পদ্ধতিগুলোকে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার অধীন করা হয়নি প্রায় সকল দেশেই। উদারনৈতিক নারীবাদ এই স্বাস্থ্য অধিকারের প্রশ্নে নিশ্চুপ থাকে। তাই এরা সত্যিকার অর্থে এই সকল মিশ্র যৌনতার মানুষদের সমান মানবিক অধিকার আদায়ের জন্যে আওয়াজ তোলেন না, লড়াই করেন না। বাংলাদেশে, বিশেষত জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে, আমাদের সমাজের ডানপন্থী রূপান্তরটি এখন প্রকাশ্য। মুহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে প্রায় দেড় বছর ধরে দেশে রাজত্ব করেছে চরম ডানপন্থী, সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মবাদী একটি গোষ্ঠী। এই সময়ে আমরা দেখেছি মিশ্র যৌন পরিচয়ের মানুষদের উপরে ভয়ংকর সব নিপীড়নের ঘটনা। এই সকল ঘটনা শুধু এই মানুষদের প্রতি শারীরিক ও প্রাণনাশের হুমকিই তৈরী করেনি, এর সাথে সাথে এই সকল মানুষদের নাগরিক হিসাবে যে অধিকার পাওয়ার কথা সেসবকে চ্যালেঞ্জ করেছে, এই সকল মানুষদের স্বাভাবিক মনুষ্য-মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করেছে। নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদ মিশ্র যৌনতার মানুষদের অধিকারের স্বপক্ষে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র ও সমাজের সকল অমানবিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

এর পরের তিনটি প্রস্তাবনা, অর্থাৎ অষ্টম, নবম ও দশম প্রস্তাবনা-ত্রয়ী হচ্ছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে ইনসাফ বা সামাজিক ন্যায় বিচার (Social justice) প্রসঙ্গে নারীবাদী ব্যাখ্যা। এই সামাজিক ন্যায়বিচার বা সোশ্যাল জাস্টিস এর প্রসঙ্গটিকে এই নারীবাদীরা কেবল নারী – পুরুষের প্রসঙ্গ হিসাবে দেখেন না, বরং সামাজিক ন্যয্যতার প্রসঙ্গটির সাথে জড়িয়ে রয়েছে বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী অবস্থান এবং সমগ্র প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষার প্রশ্ন। নয়া উদারনীতিবাদী পুঁজিবাদের যুগে দেশে দেশে উত্থান ঘটেছে চরম ডানপন্থার, এর সাথে যুক্ত হয়েছে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ আর বর্ণবাদী নিপীড়ন। নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদ এই প্রবণতাগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। আজকের পুঁজিবাদে ‘প্রফিট’ বা লাভের প্রশ্নটি এক ধরনের ঈশ্বরতুল্য হয়ে উঠেছে। ঈশ্বর যেমন সকল প্রশ্নের ঊর্ধ্বে, পুঁজিবাদের কাছে প্রফিটের প্রশ্নটি তেমনই সকল প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। তাই প্রফিটের জন্যে নয়া উদারনীতিবাদী পুঁজিবাদ শুধু মানুষের বিরুদ্ধেই নিপীড়নমূলক অবস্থানে দাঁড়ায় না, এই ব্যবস্থা প্রাণ ও প্রকৃতি বিধ্বংসী অবস্থানেও দাঁড়ায়। নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদ এই প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায় এবং প্রাণ ও প্রকৃতি সংরক্ষণের সংগ্রামকে মোটের উপরে  মানুষের মুক্তির সংগ্রামের অংশ হিসাবে মনে করে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস হচ্ছে প্রাণ ও প্রকৃতি ধ্বংসের ইতিহাস। রাষ্ট্র ও শাসক শ্রেনীর প্রত্যক্ষ যোগসাজশের মধ্যে দিয়ে দখল হয়ে গেছে বাংলাদেশের প্রকৃতি, নদী-নালা, খাল-বিল, বনাঞ্চল, শিশুদের খেলার মাঠ সবকিছু। সবকটি বড়ো শহরের পাবলিক প্লেসগুলোকে তুলে দেয়া হয়েছে মাফিয়া ব্যবসায়ীদের হাতে। সারা দেশে এদের পরিচয় গড়ে উঠেছে – নদীখোর, ভুমিদস্যু, বালুখোর ইত্যাদি নানান ধরণের নামে। নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদ এই সকল প্রাণ ও প্রকৃতি ধ্বংসকারী মাফিয়াচক্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়। বৃহত্তর গনসচেতনতা গড়ে তুলতে চায় প্রাণ ও প্রকৃতি সংরক্ষণের স্বপক্ষে। এই নারীবাদ নদী রক্ষার কথা বলে, বনভুমি কিংবা শিশুদের খেলার মাঠ রক্ষার সংগ্রামকে নিজেদের সংগ্রামের অংশ মনে করে।

এগারোতম প্রস্তাবনাটি মূলত এক সর্বব্যাপী সংগ্রামের ডাক। পিতৃতন্ত্র ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক বিপ্লবী আহবান। এই আহবানে তারাই সাড়া দেবেন যারা আধুনিক পুঁজিবাদের নিপীড়নমূলক পদ্ধতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চান এবং যারা মানুষের অধিকারের পাশাপাশি প্রাণ ও প্রকৃতির সংরক্ষণের বিষয়টিকে মানুষের রাজনৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন। এই দুটি প্রশ্নে সুনিশ্চিতভাবে প্রগতিশীল ও উদারনৈতিক দাবী করা মানুষের একটি অংশ সরে আসবেন, যারা নিজেদেরকে সরাসরি পুঁজিবাদী পদ্ধতির বিরুদ্ধে দাঁড়া করতে চান না। এরাই হচ্ছেন এক শতাংশ। এই অংশটিকে বাদ দিয়ে সমগ্র সমাজের শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত মানুষের এক সর্বাত্মক ঐক্য গড়ে তোলার আহবান জানায় এই এগারোতম প্রস্তাবনাটি।

এই লেখাটির একটি উদ্দেশ্যে হচ্ছে আজকের নারীবাদীদের মাঝে যে নানান ধরনের বিভক্তি ও মতভেদ রয়েছে, সেই বিভাজন ও মতভেদকে কমিয়ে এনে সকলকে একটি ন্যূনতম ঐক্যের দিকে শামিল হবার জন্যে প্রণোদনা তৈরি করা। নিরানব্বই শতাংশ নারীবাদী তত্ত্বের সমালোচনা রয়েছে এবং আপাদমস্তক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সমর্থক এই নারীবাদীরা মনে করেন সৃজনশীল বিতর্ক ও পর্যালোচনা সেই সকল সমালোচনাকে সমাধান করতে পারে এবং একটি বৃহত্তর বোঝাপড়া তৈরি করতে পারে। মূল প্রসঙ্গটি হচ্ছে নারী তথা সমাজের বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বৃহত্তর নারীবাদী মানুষদের একটি ছাতার নীচে শামিল হওয়া এবং এর সাথে প্রাণ ও প্রকৃতির প্রশ্নটিকে মানুষের অধিকারের প্রশ্নের সাথে যুক্ত করে নেয়া। এটাই নিরানব্বই শতাংশের নারীবাদ যা শেষ অর্থে মুক্তিমূখীন সমাজের এক নতুন আহবান, এক নতুন ইশতেহার।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাম্প্রতিকা