মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৩, ২০২৬
Homeঅর্থকড়ির জগৎপ্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটা বাতিল: সমতার নামে নতুন বৈষম্যের জন্ম

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটা বাতিল: সমতার নামে নতুন বৈষম্যের জন্ম

‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’—এই জনপ্রিয় স্লোগানের প্রবল ঢেউয়ে ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনার সরকার। আন্দোলনের নাম ছিল ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনে বহু নারী শিক্ষার্থীও প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে বলেন, “নারী কোটা চাই না” । তাদের প্রত্যাশা ছিল—লিঙ্গভেদ নয়, মেধা হবে নিয়োগ ও মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড।

কিন্তু প্রশ্ন আজ—সেই প্রত্যাশা কি বাস্তবে রূপ নিয়েছে? অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে নারীরা কি বৈষম্য থেকে মুক্তি পেয়েছেন, নাকি আরও কঠিন বৈষম্যের শিকলে বন্দি হয়েছেন? অনানুষ্ঠানিক পরিমণ্ডলে নারীরা বরাবরই অপমান, লাঞ্ছনা, বৈষম্য ও অন্যায়ের শিকার—এ কথা নতুন নয়। তবে যে ধাক্কাটি এবার এলো, তা এলো রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নীতি থেকেই। ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করে। এ সিদ্ধান্তের অভিঘাত সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করলেন দেশের তৃণমূলের সেই গ্রামীণ নারী, যিনি শিক্ষাক্ষেত্রে সামান্য এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন বুকে লালন করতেন। এই নীতি পরিবর্তন যেন মুহূর্তেই তাদের সেই স্বপ্নের দরজায় শক্ত করে খিল এঁটে দিল।

বাংলাদেশে কোটা সংস্কার এখন আর কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি রাষ্ট্র কাঠামো, সমঅধিকারের রাজনীতি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক পরিবর্তনের ফলে সরকারি চাকরিতে কোটা সুবিধা ৫৬ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু এই শতকরা হ্রাসের পেছনে যে জনগোষ্ঠীর জীবন-বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছে তারা হলো নারী, আদিবাসী ও অনগ্রসর অঞ্চল থেকে আগত চাকরি প্রার্থীরা। প্রশ্ন উঠছে সমতা প্রতিষ্ঠার আগেই বিশেষ সুরক্ষা তুলে নেওয়া কি রাষ্ট্রীয় ন্যায্যতার সঙ্গে যায়?

২০১৮ সালের শিক্ষার্থী আন্দোলনের পর কোটা প্রশ্ন জাতীয় বিতর্কে রূপ নেয়। পরবর্তীতে আদালতের রায় অনুযায়ী নতুন কাঠামো তৈরি হয়, যেখানে কোটার হার নাটকীয়ভাবে কমে যায়। সরকারের যুক্তি ছিল যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তব সমস্যা হলো সাম্যহীন সমাজে যোগ্যতার প্রতিযোগিতা কখনোই সমান হয় না। প্রতিযোগিতার শুরুতেই কেউ এগিয়ে থাকে, কেউ পিছিয়ে।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম ও মফস্বল শহরে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাওয়া এবং তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটা দীর্ঘদিন ধরে এক অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করে এসেছে। কোন গ্রামীণ নারী যখন শিক্ষকতার মতো মর্যাদাপূর্ণ সরকারি চাকরি অর্জন করেন তিনি শুধু নিজের জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করেন না—অঞ্চলের অসংখ্য কিশোরী ও তরুণীর অভিভাবকদের কাছেও হয়ে ওঠেন জীবন্ত উদাহরণ। তার সাফল্য দেখেই অনেক পরিবার বুঝতে শেখে মেয়েদের পড়াশোনা করিয়ে দিলে তারাও সমাজে মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করতে পারে। এখান থেকেই শুরু হয় নারীর ক্ষমতায়ন, আত্মনির্ভরতা এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার এক নতুন যাত্রা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে নারীরা এখনও কর্মসংস্থান, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সামাজিক স্বীকৃতি এবং চলাচলের স্বাধীনতায় নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। যে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে একসময় ৬০ শতাংশ নারী সংরক্ষণ ছিল, সেটিই বহু গ্রামীণ নারীর জন্য অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রথম দরজা খুলে দিয়েছিল। সেই নীতি বাতিল হওয়ায় এখন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠেছে আরও বৈষম্যমূলক ও প্রতিকূল, যেখানে শহুরে সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমান লড়াইয়ে গ্রামীণ নারীরা অবশ্যম্ভাবীভাবে পিছিয়ে পড়বে।

এছাড়া নারীর প্রতি বৈষম্য বাংলাদেশে কোন নতুন ঘটনা নয়। সম্পত্তির মালিকানা থেকে শুরু করে উত্তরাধিকার আইন, অর্থনৈতিক সম্পদে প্রবেশাধিকার, পারিবারিক সিদ্ধান্ত, ভূমি ব্যবস্থাপনা, এমনকি সামাজিক ভাবনাচিন্তায়ও নারী এখনও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। পুরুষ জন্মসূত্রে যে সুবিধা পায় নারী তা অর্জন করেও পায় না—এই বৈষম্যই আসলে প্রতিযোগিতার সূচনালাইন নির্ধারণ করে দেয়। যেখানে নারীর সম্পদ- নিরাপত্তা- সুযোগ নিশ্চিত নয়, যেখানে একজন নারী তার বাপের বাড়ি- স্বামীর বাড়ি- কিংবা রাষ্ট্র ইত্যাদি কোন জায়গাতেই সমঅধিকারভিত্তিক নিরাপত্তা পান না, সেখানে তাকে বলা হচ্ছে—“এখন থেকে তোমাকে কোন বাড়তি সহায়তা ছাড়াই প্রতিযোগিতা করতে হবে”!

যে কাঠামো নারীকে পিছিয়ে রাখে, সেই কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে কোটা বাতিল করা মানে বৈষম্যকে আরও তীব্র করা। শতাব্দীব্যাপী তৈরি অসমতা ভাঙার কোন ব্যবস্থা না করেই সমান মাপকাঠি প্রয়োগ করা ন্যায়বিচার নয়, বরং ‘প্রতিযোগিতার নাম’ করে নারীর অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার আয়োজন বলা যেতে পারে

এই সিদ্ধান্তের পরিণামে নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন শুধু মন্থরই হবে না, গত এক দশকের অর্জন পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। নারী উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে সুরক্ষা নয়, কাঠামোগত পরিবর্তনই জরুরি–এমনটাই বিশেষজ্ঞদের অভিমত। কোটা সেই কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রথম ধাপ, যা বাতিল করে কেবল নীতি নয়—নারীর স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও অগ্রযাত্রাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা হয়েছে।

এই ফাঁপা উচ্ছ্বাস যে বেশিদিন টিকবে না, তা আমরা ইতোমধ্যেই বুঝে গিয়েছিলাম। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটা বাতিলের পর এনসিপি এক বিবৃতি দেয় যা বিডিনিউজ২৪ডটকম-এ প্রকাশিত হয়। সেই বিবৃতিতে তাদের অবস্থান ছিল বর্তমান কাঠামোয় মোট চাকরির ১০ শতাংশের বেশি কোটা থাকা উচিত নয়, মেধাভিত্তিক নিয়োগই হবে প্রধান। আর কোটা কেবল বিশেষ সুবিধা হিসেবে সীমিত পরিসরে ব্যবহৃত হতে পারে।
প্রথম শুনতে এ বক্তব্য অনেকের কাছেই যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে মোড় নেয়। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ১৯ অক্টোবর ২০২৫-এ ‘আজকের পত্রিকায়’ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এনসিপি নেত্রী সামান্তা শারমিন বলেন— “নারীদের কোটা ব্যবস্থা তুলে দেওয়া তাদের জন্য হুমকিস্বরূপ। কোটা তুলে দিলে তাদেরকে খুঁজেও পাওয়া যাবে না। আমি মনে করি নারীদের ক্ষেত্রে অবশ্যই কোটা ব্যবস্থা থাকা উচিত, যাতে করে তাদেরকে আমরা নিয়ে আসতে পারি সামনের দিকে বা চাকরির ক্ষেত্রে।”

বাংলাদেশের সংবিধান নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির প্রশ্নে অত্যন্ত স্পষ্ট। অনুচ্ছেদ ২৮(৪) বলছে—নারী, শিশু বা অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন থেকে রাষ্ট্রকে কেউ নিবৃত্ত করতে পারবে না। অর্থাৎ কোটা ব্যবস্থা বৈষম্য নয় বরং বৈষম্য দূর করার স্বীকৃত উপায়। একইসঙ্গে অনুচ্ছেদ ১৯ রাষ্ট্রের দায়িত্ব নির্ধারণ করে—সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা। আরও স্পষ্টভাবে অনুচ্ছেদ ১৯(৩) ঘোষণা করে—জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। এই ধারাগুলো প্রমাণ করে নারী কোটা কোনও উপকারভোগী সুবিধা নয়; এটি একটি সংবিধানসম্মত অধিকার যা নারীর অগ্রগতির পথ সুগম করতে এবং তাদের বাস্তব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পরিবেশ তৈরি করতে রাষ্ট্রকে সহায়তা দেয়। তাই কোটা বাতিল করা শুধু নীতিগতভাবে নয়, সংবিধানের চেতনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

কোটা সংস্কারকে ঘিরে বিতর্ক যতই তীব্র হোক, আলোচনাকে পরিষ্কার ও যুক্তিসঙ্গত পথে নিতে হলে তিনটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর অপরিহার্য। প্রথমত—কোটা কি থাকা উচিত? উত্তর হলো হ্যাঁ এবং এটি কোন আবেগের বিষয় নয় বরং বাস্তবতার স্বীকৃতি। সমাজে এখনও লিঙ্গ, অঞ্চল, অর্থনৈতিক অবস্থা, শ্রেণি, জাতিগোষ্ঠী ও শারীরিক সক্ষমতার বৈষম্য এতটাই গভীর যে সমান নিয়ম প্রয়োগ করলেই সমান সুযোগ তৈরি হয় না। যতক্ষণ না এইসব বৈষম্য দূর হয় এবং প্রতিযোগিতার মঞ্চ সত্যিকার অর্থে সবার জন্য সমতল হয়ে ওঠে ততক্ষণ কোটা বরং ন্যায়সঙ্গতার ভিত্তি রক্ষা করে।

দ্বিতীয়ত—কোটা কত শতাংশ হওয়া উচিত? এটি কোন ব্যক্তিগত মত, রাজনৈতিক পছন্দ বা কৌতুকপূর্ণ অনুমানের বিষয় নয়। একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে এ বিষয়ে নির্ভর করতে হবে গবেষণা, জনগোষ্ঠীর তথ্যভিত্তিক প্রোফাইল, অংশগ্রহণের হার, শিক্ষায় প্রবেশাধিকার এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর। কোটা এমন হওয়া উচিত যা পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে, একইসঙ্গে সামগ্রিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভারসাম্যও রক্ষা করে।

তৃতীয়ত—এই সিদ্ধান্ত নিবে কারা? নীতি প্রণয়নের সবচেয়ে বড় সংকট হলো নীতির প্রভাব যারা ভোগ করেন তাঁদেরকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া। অথচ কোটা সংস্কার নিয়ে কোন টেকসই সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা না যদি নারী, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক, পশ্চাৎপদ অঞ্চল ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা হয়। কারণ নীতি তখনই জীবিত ও কার্যকর থাকে যখন তা প্রভাবিত জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, চাহিদা ও বাস্তবতা প্রতিফলিত করে।

সুতরাং কোটা প্রশ্নটি শুধু সুযোগের বণ্টনের নয়–এটি সমতা, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের প্রশ্নও। এই তিনটি মূ্ল প্রশ্নের সঠিক, তথ্যনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উত্তর ছাড়া কোটা সংস্কার কখনোই টেকসই বা ন্যায্য হতে পারে না। কোটা সংস্কারকে অনেকেই সমতার পথে অগ্রগতি হিসেবে দেখাতে চান। কিন্তু সমতার নাম করে যদি বাস্তবের বৈষম্য আরও তীব্র হয় তবে সেটি নীতি নয়, নিছক আত্মপ্রবঞ্চনা। সমাজে বৈষম্য বিদ্যমান থাকতেই পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই অসমতার দেয়াল ভাঙা, নতুন দেয়াল নির্মাণ নয়। উন্নয়ন শুধুমাত্র অবকাঠামো, জিডিপি বা পরিসংখ্যানে ধরা দেয় না। ন্যায়বিচার ছাড়া কোন উন্নয়নই স্থায়ী হয় না।

আজকের বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি সকল নাগরিককে সমানভাবে সামনে এগিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করবো, নাকি ‘সমতা’র নামে সেই পথ আরও কঠিন করবো? বাস্তবতা হলো সমান নিয়ম দিয়ে অসম ভিত্তি সংশোধন করা যায় না। যারা সামাজিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিকভাবে পিছিয়ে তাদের জন্য কোটা কোন অবলম্বন নয়; এটি রাষ্ট্র স্বীকৃত ন্যূনতম সিঁড়ি যা তাদের প্রতিযোগিতার আসরে উঠার সুযোগ করে দেয়।

 

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাম্প্রতিকা