বুধবার, আগস্ট ৫, ২০২৬
Homeআইন ও নারীবৈবাহিক ধর্ষণ: ঔপনিবেশিক আইনের দীর্ঘ ছায়া

বৈবাহিক ধর্ষণ: ঔপনিবেশিক আইনের দীর্ঘ ছায়া

বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন ২০২৬ অনুযায়ী ধর্ষণের সংজ্ঞা, “যদি কোন ব্যক্তি বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন করিয়া বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন শিশুর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌনকর্ম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন”। এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি ‘বিবাহ বন্ধন ব্যতীত’ কথাটি। অর্থাৎ ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’এখনও বাংলাদেশের আইনে অনুপস্থিত।

বৈবাহিক ধর্ষণ বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে ধর্ষণ কী। UN Women এর মতে, “Rape is any sexual penetration without consent or as a result of intimidation, force, fraud, coercion, threat, deception, use of drugs or alcohol, abuse of power or of a position of vulnerability, or the giving or receiving of benefits. This can be by any person known or unknown to the survivor, within marriage and relationships, and during armed conflict.” বাংলায় বললে, “ধর্ষণ হলো এমন যেকোন ধরনের যৌন অনুপ্রবেশ যা ভুক্তভোগীর সম্মতি ছাড়া সংঘটিত হয়, অথবা ভয়ভীতি প্রদর্শন, বলপ্রয়োগ, প্রতারণা, জবরদস্তি, হুমকি, ছলনা, মাদক বা অ্যালকোহলের প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুক্তভোগীর অসহায় অবস্থার সুযোগ নেওয়া, কিংবা কোনো সুবিধা দেওয়া বা গ্রহণের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। অপরাধী ভুক্তভোগীর পরিচিত বা অপরিচিত যে-ই হোক না কেন, বৈবাহিক সম্পর্ক বা অন্য যেকোন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যেই হোক, কিংবা সশস্ত্র সংঘাতের সময় সংঘটিত হোক, তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য।” অর্থাৎ, বৈবাহিক সম্পর্ক আছে কি নেই তা এখানে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। ভুক্তভোগীর কনসেন্টই নির্ধারণ করে কাজটি ধর্ষণ, নাকি না।

কাজেই ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতাকে বুঝতে কনসেন্ট বোঝার বিকল্প নেই। সহজ বাংলায় কনসেন্ট হলো সম্মতি। UN Women এর মতে, এটি হতে হবে–

১। উৎসাহের সাথে (Enthusiastic): ব্যক্তি স্পষ্টভাবে, উৎসাহের সাথে হ্যাঁ বলবে। যদি সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়, অস্পষ্ট উত্তর দেয়, জড়তা প্রদর্শন করে, ‘জানি না’ বলে, কিংবা চুপ থাকে, তবে তা কনসেন্ট নয়৷

২। স্বাধীনভাবে প্রদত্ত (Given Freely): ব্যক্তি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায়, স্বজ্ঞানে ও স্বাধীনভাবে কনসেন্ট দেবে। ভয় দেখিয়ে, জোর করে, গিল্ট ট্রিপ করে আদায় করা হ্যাঁ কনসেন্ট নয়। অচেতন বা নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি কনসেন্ট দিতে পারে না।

৩। জেনেশুনে (Informed): ব্যক্তি তখনই কনসেন্ট দিয়েছে বলে ধরতে হবে যখন সে পুরো ব্যাপারটা সম্পর্কে অবগত থাকবে, কোন ধোঁকা বা ধোঁয়াশার মধ্যে থাকবে না। মিথ্যা বলে কনসেন্ট আদায় করলে তা কনসেন্ট নয়। এবং একইসাথে সেই ব্যক্তিকে হতে হবে প্রাপ্তবয়স্ক। শিশুরা কনসেন্ট দিতে পারে না।

৪। নির্দিষ্ট (Specific): কনসেন্ট হবে নির্দিষ্ট। যেমন আপনি কাউকে সম্মতি দিয়েছেন আপনাকে স্পর্শ করার, তার মানে এই নয় যে সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনাকে চুমু খাওয়ারও অনুমতি পেয়ে গেছে। স্পর্শ করা, আলিঙ্গন করা, বা আরও ঘনিষ্ট হওয়া — প্রতিটি কাজের জন্যই আলাদা আলাদা করে কনসেন্ট প্রয়োজন।

৫। প্রত্যাহারযোগ্য (Reversible): কনসেন্ট যেকোন সময়ে প্রত্যাহারযোগ্য। একবার কনসেন্ট দিয়ে দিলেই ব্যক্তি বাঁধা পড়ে গেলো এমন নয়। কনসেন্টদাতা যেকোন সময়, যেকোন কারণে কনসেন্ট প্রত্যাহার করার স্বাধীনতা রাখেন। এর জন্য তিনি কোন রকম জবাবদিহি করতে বাধ্য নন।

এজন্যই বিয়ের সার্টিফিকেটে সই করা মানেই আজীবনের জন্য কনসেন্ট দিয়ে দেয়া নয়—যেটি বাংলাদেশের অনেক মানুষ এখনও ভুল ধারণা করে থাকেন। কনসেন্ট একদিন সারাজীবনের মতো দিয়ে দেয়া যায় না। এটি একটি অবিরত প্রক্রিয়া৷ এটি ব্যক্তি যেকোন সময় পরিবর্তন বা প্রত্যাহার করতে পারেন। এটি একজন মানুষের ন্যূনতম ব্যক্তিস্বাধীনতা।

ধরুন একজন নারীর স্বামীর সাথে সম্পর্ক খারাপ। স্বামী অত্যাচারী। এরকম স্বামীর সাথে সেই নারী স্বাভাবিকভাবেই যৌন মিলনে আগ্রহী হবে না। এমতাবস্থায় সে যদি জোর করে বা ভয় দেখিয়ে তার সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করে তবে সেটা হবে স্ত্রীর কনসেন্টের বিরুদ্ধে। আর যেই যৌন সম্পর্কে এক পক্ষ কনসেন্ট দেয় না, সেটিই ধর্ষণ। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রীয় আইন এখনও একে ধর্ষণ হিসেবে দেখে না। যেন বিয়ে হলেই একজন মানুষ কনসেন্ট দেয়া বা প্রত্যাহার করার অধিকার হারিয়ে ফেলেন।

যে আচরণ অন্য যে কেউ করলে এবং ভিকটিম যে ধরণের শারীরিক-মানসিক কষ্টের শিকার হলে তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হতো, সেই একই ধরণের আচরণ একজন বিবাহিত পুরুষ তার স্ত্রীর সাথে করলে, সেই একই কষ্ট সেই বিবাহিতা নারী ভোগ করলে কেন তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে না? এতে করে কি এই বার্তাই দেয়া হয় না যে আমাদের সিস্টেম আসলে নারীকে পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে দেখে? আর এরকম সমাজ ও রাষ্ট্রে ধর্ষণকে দেখা হয় নারীর উপরে অত্যাচার হিসেবে নয়, বরং পুরুষের সম্পত্তির ক্ষতি হিসেবে? সে কারণেই যখন অবিবাহিতা নারী ধর্ষিতা হয় তখন সেই ধর্ষকের উপরে সমাজ ক্রোধান্বিত হয়। কারণ হিসেবে দেখায় যে ওই নারী কোন পুরুষের মা, বোন, স্ত্রী ইত্যাদি। কিন্তু যখন বিবাহিতা নারী তার স্বামীর হাতে একই অত্যাচারের শিকার হোন তখন তাকে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয় না। কারণ সেক্ষেত্রে ভাবা হয় ওই লোকটি তার স্ত্রী নামক সম্পত্তিকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করেছে।

বৈবাহিক ধর্ষণ অবৈবাহিক ধর্ষণের চাইতে কোন অংশে কম নিপীড়ন নয় বরং আরও বেশি। কারণ বিবাহ বহির্ভূত ধর্ষণের ক্ষেত্রে অন্তত ভিকটিমকে নিপীড়কের সাথে জীবন কাটাতে হয় না (যদি না ধর্ষক নিকটাত্মীয় হয়, কিন্তু সেক্ষেত্রেও অন্তত তাকে রাষ্ট্রীয় আইন ধর্ষণ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়)। কিন্তু স্বামী কর্তৃক যে নারী ধর্ষনের শিকার হয় তাকে তার ধর্ষকের সাথেই সর্বদা ঘরসংসার করতে হয়। এরফলে নারীটি যেই ট্রমার মধ্য দিয়ে যায় সে ব্যাপারে তার অভিযোগ জানানোর কোন জায়গা থাকে না। কারণ সে যে আসলে ধর্ষনের শিকার  হচ্ছে, সেটিই আমাদের সমাজ বা রাষ্ট্র স্বীকার করে না।

এই ধারা সেই ১৮৬০ এর ব্রিটিশ প্রবর্তিত আইন থেকে চলে আসছে। বাংলাদেশের দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ৩৭৫ নং ধারায় বলা হয়েছে, “Sexual intercourse by a man with his own wife, the wife not being under thirteen years of age, is not rape.” এরপরে প্রায় দুই শতাব্দী পার হয়েছে, একবিংশ শতাব্দীতে আইনে সংস্কার এনে এইজ অফ কনসেন্ট বাড়ানো হয়েছে, আরও নানা সংস্কার করা হয়েছে, তবু বৈবাহিক ধর্ষণকে এখনও আমাদের আইন স্বীকার করেনি।

ঔপনিবেশিক শাসনের ধারাবাহিকতায় দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে এই অবস্থা বিদ্যমান। তবে নেপাল ও ভুটান এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এই দুটি দেশ রাষ্ট্রীয় আইনে বৈবাহিক ধর্ষণকে স্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে৷

বৈবাহিক ধর্ষণ বিশ্বের সব উন্নত দেশেই আজ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যেই ব্রিটিশ আইনের ধারাবাহিকতায় আজও আমাদের দেশে এটি বৈধ, স্বয়ং সেই ব্রিটিশরা আজ নিজেদের দেশে একে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। আসলে এখানে ব্রিটিশদের দোষ দেয়ার সুযোগ নেই। কারণ আমরা বহু আগেই তাদের কাছ থেকে স্বাধীন হয়েছি। আমাদের রাষ্ট্র স্বাধীনভাবে একাধিকবার আইনে সংশোধনও এনেছে। অথচ প্রতিবারই বৈবাহিক ধর্ষণের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এই ২০২৬ সালের আইনেও ‘বিবাহ বন্ধন ব্যতীত’ উল্লেখ করে রাষ্ট্র সেই ব্রিটিশ ধারাই জারি রেখেছে। এটি কোন ভুল নয়, বরং বিবাহিত মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি রাষ্ট্রের উদাসীনতা।

বৈবাহিক ধর্ষণকে আইনত বৈধতা দিয়ে রেখে নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গসমতার আলাপ অসম্পূর্ণ। দেশের বিপুলসংখ্যক বিবাহিতা নারীকে যেখানে কার্যত পুরুষের সম্পত্তি বানিয়ে রাখা হয়েছে, সেখানে কীভাবে আমরা নারী স্বাধীনতার কথা বলি? রাষ্ট্রীয় আইনে বৈবাহিক ধর্ষণকে অন্তর্ভুক্ত না করলে দেশ কখনোই প্রকৃত নারীবান্ধব হতে পারবে না। এই ২০২৬ সালে এসেও এহেন বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক ঔপনিবেশিক আইন জারি রাখা এদেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিকের প্রতি অন্যায়। তাই অবিলম্বে বৈবাহিক ধর্ষণকে আইনে অন্তর্ভুক্ত করে রাষ্ট্রকে নাগরিকবান্ধব করা এখন সময়ের দাবী।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাম্প্রতিকা