মঙ্গলবার, জুন ১১, ২০২৪
Homeচোখের আলোয় দেখেছিলেমধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি সমাজের নেতিবাচক মনোভাব জারি থাকার দায় কার

ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি সমাজের নেতিবাচক মনোভাব জারি থাকার দায় কার

কুকুরে কামড় দিলে সম্ভ্রম যায় না, তাহলে ধর্ষিত হলে সম্ভ্রম চলে যাবে কেন? নিশ্চয়ই সম্ভ্রম নারীর কোন বিশেষ অঙ্গে থাকে না?

১০ অক্টোবর ২০২২ খ্রিস্টাব্দে রাজধানীর ব্র‍্যাক ইন সেন্টারে কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি লাখ টাকা দামের এই প্রশ্ন দুটি উত্থাপন করেন। তিনি আরো বলেন :

যতোক্ষণ পর্যন্ত সমাজ মনে করবে— ধর্ষণ হলে সম্ভ্রমহানি ঘটে ততোক্ষণ পর্যন্ত ধর্ষণ চলতে থাকবে। এটা একটা হাতিয়ার হিসেবে কেউ না কেউ ব্যবহার করবে। যুদ্ধে ব্যবহার করবে, স্বাভাবিক অবস্থায় ব্যবহার করবে, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ব্যবহার করবে, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে ব্যবহার করবে।

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য ও কিছু গবেষণায় পাওয়া ফলাফল থেকে দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি বিদ্যমান সমাজের নেতিবাচক মনোভাব নারীকে, নারীর পরিবারকে কাবু করার জন্য ধর্ষণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার বাস্তবতা তৈরি করে। তার মানে দাঁড়ায়, ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে হলে সবার আগে ধর্ষিতা নারীর প্রতি প্রচলিত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। দরকার এই উপলব্ধি ছড়িয়ে দেওয়া যে, ধর্ষণের শিকার হলেই নারীর সম্ভ্রম চলে যায় না। নারীর সম্ভ্রম তার বিশেষ কোন অঙ্গে থাকে না।

এখন আমার দুইটা কোটি টাকার প্রশ্ন আছে। ‘ধর্ষণ করলে নারীর সম্ভ্রম চলে যায়’— ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি মানুষের এই যে নেতিবাচক মনোভাব, এটা যুগ যুগ ধরে সমাজমানসে জারি আছে কীভাবে এবং এই জারি থাকার দায় কার?

দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কার্ল মার্ক্স তাঁর বিভিন্ন লেখায় দেখিয়েছেন, কীভাবে উৎপাদন অর্থাৎ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা (কাঠামো) একটা দেশের অপরাপর বিষয় (উপরিকাঠামো)-কে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করে। এই কাঠামো এবং উপরিকাঠামোর (Structure and Super Structure) মধ্যে একটা ডায়ালেক্টিক্যাল সম্পর্কও রয়েছে অর্থাৎ একটি অপরটিকে প্রভাবিত করে।

আর “সামাজিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার শর্তই হলো উৎপাদনের শর্তগুলোকে পুনরুৎপাদন করা। এই পুনরুৎপাদন ছাড়া সমাজ টিকতে পারে না।”

দার্শনিক ল্যুই আলথুজার ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘Ideology and Ideological State Apparatuses’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি রাষ্ট্রে শাসক ও শাসকশ্রেণি নিজেদের আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখে এবং তাদের ভাবাদর্শগুলো পুনরুৎপাদন করে চলে।

ভাবাদর্শটা আসলে কী? কার্ল মার্ক্সের দেখানো উপরিকাঠামোই (Super structure) হলো একটা রাষ্ট্রের ভাবাদর্শ। এখানে ভাবাদর্শটা হলো, একটা রাষ্ট্রের প্রায় ৯৯% মানুষই মনে করে, ধর্ষিত হলে নারীর সম্ভ্রম চলে যায় এবং সমাজে তারা আর স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরে আসতে পারবে না, তাদের ফিরে আসতে দেওয়া হয় না, সেটাই। আলথুজারের মতে, ভাবাদর্শ কোন ‘ভাবের জগত’-এ থাকে না, এটি থাকে রাষ্ট্রের বিবিধ প্রতিষ্ঠানে ও তাদের অনুশীলনে।

আলথুজার তাঁর প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র তথা শাসক এবং শাসকশ্রেণি নিজেদের শাসন ক্ষমতা, আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে, বিস্তার ঘটাতে ২ ধরনের অ্যাপারেটাস (হাতিয়ার) ব্যবহার করে থাকে :

১. রিপ্রেসিভ স্টেট অ্যাপারেটাস (নিপীড়নমূলক হাতিয়ার)— পুলিশ, সেনাবাহিনী, আদালত, সংসদ, জেলখানা ইত্যাদি।

২. আইডিওলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাস (ভাবাদর্শিক হাতিয়ার)— শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন, পরিবার, সংবিধান, আইন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, ট্রেড ইউনিয়ন, চলচ্চিত্র, শিল্প, নাটক, রেডিও, টেলিভিশন, পত্রিকা ইত্যাদি।

আলথুজার রাষ্ট্রকে দেখেন এই দুইরূপী হাতিয়ারের সমন্বিত ও পারস্পরিক তৎপরতার ক্ষেত্র এবং তার ফল হিসেবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক দেশটির জন্মলগ্ন থেকেই এর শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে পুঁজিপতি শ্রেণি। সেই হিসেবে রাষ্ট্রের আইডিওলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাসগুলোও দখলে রেখেছে এবং নিয়ন্ত্রণ করছে শাসক এবং শাসক শ্রেণির আইডিওলজি (ভাবাদর্শ)-কে ধারণ করা ব্যক্তিরাই।

অর্থাৎ স্বাধীনতার পর গত ৫২ বছর ধরে যে দলগুলো দেশ শাসন করেছে, তারাই তো আমাদের আজকের সমাজ-মনস্তত্ত্ব গঠনে ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় থাকা অন্য দলগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম! মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া একটা রাজনৈতিক দল ৩ টার্মে (১৯৭১-৭৫, ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২৩) প্রায় ২৪ বছর শাসন ক্ষমতায় থাকার পরও একটা দেশের গোটা জনমানসে যদি এই ধরনের ভাবাদর্শ বিরাজ করে যে, ‘নারীর সম্ভ্রম তার বিশেষ কোন অঙ্গে থাকে এবং ধর্ষিত হলে নারীর সম্ভ্রম চলে যায়’ এবং ক্ষমতায় থাকাকালে সেই দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন নারী মন্ত্রী এর জন্য নিজেদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার না করে উল্টো জনগণকে দোষারোপ করেন, তাহলে কি আমরা এই প্রশ্ন রাখতে পারি না যে, এখনো সেই ভাবনা গড়ে ওঠা এবং টিকে থাকার দায়টা আসলে কার? সেই দেশের শাসক এবং শাসক শ্রেণির, না শাসিত শ্রেণির? আপনারা যারা বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় থেকে এই ধরনের চিন্তাধারাকে উৎপাদন, পুনরুৎপাদন করেছেন, টিকিয়ে রেখেছেন, দায়টা তাদের? নাকি আজন্ম শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত, বৈষম্যের শিকার অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত জনগণের?

গত ৫২ বছর যারা বিভিন্ন সময় দেশ শাসন করেছেন, তারাই মূলত ‘ধর্ষিত হলে নারীর সম্ভ্রম চলে যায়’ এমন ধারণা এই একুশ শতকেও সমাজে টিকে থাকার জন্য দায়ী। তারা মানুষকে প্রকৃত শিক্ষা না দিয়ে, নারীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথকে সুগম না করে তাদের যৌন সামগ্রী এবং সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র করে রেখে, দেশের অর্থনীতির বিকাশ না ঘটিয়ে সামন্তীয় মনোভাব ও নারী-পুরুষের বৈষম্য টিকিয়ে রেখেছে। তবে যারা ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার’ ইত্যাদির অঙ্গীকার করেও এবং সর্বাধিক সময় দেশ শাসন করেও সমাজ থেকে এমন ধারণা নির্মূলে পদক্ষেপ নেয়নি, কাজ করেনি, তাদের দায়টা অনেক অনেক বেশি।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাম্প্রতিকা