মঙ্গলবার, জুন ১১, ২০২৪
Homeকৃষাণীর সকাল-সন্ধ্যাবর্ষায়ও কর্মব্যস্ত দিন পার করেন নরসিংদীর চরাঞ্চলের কৃষাণীরা

বর্ষায়ও কর্মব্যস্ত দিন পার করেন নরসিংদীর চরাঞ্চলের কৃষাণীরা

ক্যালেন্ডারের পাতা বলছে, এখন সময়টা শরৎকাল। কিন্তু প্রকৃতিতে বিরাজ করছে ঋতু বর্ষা। প্রতি দুই মাসে এক ঋতু হলেও আমাদের দেশে বর্ষা ঋতুর স্থায়িত্ব প্রায় চার মাস জুড়ে থাকে। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসারে, বর্ষার আগমন ঘটে জুনের মাঝামাঝি সময়ে এবং বিদায় নেয় সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বা অক্টোবরের প্রথম দিকে।

বর্ষাকালের ঘন বৃষ্টিতে খাল-বিল, নদী-নালায় নতুন পানি এসে টইটুম্বুর হয়ে যায়। ডুবে যায় দেশের নিম্নাঞ্চলগুলো। তখন সেখানকার গ্রামগুলোকে মনে হয় যেন একেকটা দ্বীপ। সংযোগ দ্বীপ বা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এইসব অঞ্চলে নিচু জমিতে কৃষিকাজ তেমন একটা করা যায় না। বর্ষার শুরুর দিকে নিচু জমিগুলো যখন ভেজা ভেজা থাকে, তখন খুব সামান্য জমিতে অল্প কিছু সংখ্যক কৃষক পানিতে টিকে থাকতে পারে এমন ধানের বীজ ছিটিয়ে দেন। নরসিংদীর স্থানীয় ভাষায় এই ধানকে বরার ধান বলে। এই ধানের আবাদের জন্য পরবর্তীতে তেমন কোন পরিচর্যার দরকার হয় না। তাই এই সময়টাতে কৃষকেরা অবসর সময় পার করেন। কেউ কেউ বর্ষার পানিতে মাছ ধরেন। আবার কেউ কেউ কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে যান।

কিন্তু অবসর জোটে না এইসব চরাঞ্চলের কৃষাণীদের। বাড়ির আনাচে-কানাচে খোলা জায়গায় পুঁতে দেন নানান জাতের শাক-সবজির বীজ বা চারাগাছ। গ্রীষ্মের রসালো ফল খেয়ে সবাই তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন। উচ্ছিষ্ট হিসেবে ফলের বীজগুলো বেশিরভাগ গিয়ে জমা হয় আবর্জনার স্তূপে। তখন কোন কোন গৃহিণী সেই বীজগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় পুঁতে দেন ভবিষ্যতে ফল দেবে, এই আশায়। বর্ষার পানি পেয়ে বীজ অঙ্কুরিত হয়, ডালপালা মেলে, পরিণত হয় বিশাল বৃক্ষে। আমাদের গ্রামীণ কৃষিতে এই কাজগুলো নারীরা করে থাকেন গৃহস্থালির কাজ হিসেবে, কৃষিকাজের কোন রকম স্বীকৃতি ছাড়াই।

মুরগিকে খাবার দিচ্ছেন রীণা বেগম | ছবি : নারী অঙ্গন

নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার অন্তর্গত মেঘনা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত একটি চর ‘বালুয়াকান্দি’। রীণা বেগম সেখানকার একজন কৃষাণী। স্বামী আর চার সন্তান নিয়ে তার সংসার। স্বামী ও বড় ছেলে থাকেন প্রবাসে। সংসারের যত দায়-দায়িত্ব, সবকিছু সামলান একা হাতে। প্রতি বছর ৬০ শতাংশ (দেড় কানি) জমিতে ধান চাষ করেন। সংসারের পুরো বছরের চালের চাহিদা পূরণ হয়ে যায় এতে। জমিতে ফসল ভালো হলে সেই বছর উদ্বৃত্ত চাল বিক্রিও করেন।

বেশ কয়েক বছর কৃষি প্রণোদনা হিসেবে ধানের বীজ, সরিষা বীজ, বাদাম বীজ, ইউরিয়া সার পেয়েছেন। কিন্তু এই বছর কৃষি প্রণোদনা পাননি। তাই এই বছর জমিতে ফসল ফলাতে খরচ বেশি হয়েছে। নিজের জমির খড়, খুদ, কুঁড়া, ঘাস দিয়ে বাড়িতে গরু, ছাগল, রাজহাঁস, মুরগী পালন করেন রীণা বেগম। এসব থেকে প্রাপ্ত দুধ, ডিম, মাংস দিয়ে পরিবারের আমিষের চাহিদা পূরণ করেন তিনি।

২ শতাংশ পরিমাণ বসতভিটায় জায়গা খুবই কম। তবুও বাড়ির আনাচে-কানাচে স্বল্প ফাঁকা জায়গায় রোপণ করেন নানান জাতের শাকসবজি। এ বছর লাগিয়েছেন ধুন্দুল, বরবটি, চালকুমড়া, শিম, বেগুন। গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি কৃষিকাজ সামলানোর ব্যাপারে কথা হয় রীণা বেগমের সাথে। খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। নামাজ পড়ে বাড়ি-ঘর ঝাঁট দিয়ে হাস-মুরগী, গরু-ছাগলগুলো খোঁয়াড় থেকে বের করেন, খাবার খাওয়ান। রাজহাঁসগুলোকে নদীর পানিতে দিয়ে আসেন। বর্ষাকালে ছাগলগুলোকে নৌকা দিয়ে কাছাকাছি যে জমিগুলো এখনো ডুবে যায়নি, এমন ক্ষেতে দিয়ে আসেন। গরুকে খড়-ঘাস লতা-পাতা খেতে দেন, গোয়ালঘর পরিষ্কার করেন। পরিবারের জন্য রান্না-বান্না করেন, গৃহস্থালির কাজ করেন। সংসারের কাজে ছেলে-মেয়েরা সাহায্য করে। পড়ন্ত বিকেলে গরু-ছাগল, হাস-মুরগিগুলোকে খোঁয়াড়ে ঢোকান। সন্ধ্যায় সকল ব্যস্ততা শেষে দুই ছেলে, এক মেয়ে (বিবাহিত) আর এক নাতনিকে নিয়ে সুন্দর অবসর সময় কাটান।

রীণা বেগম গত বছর একটা গরু বিক্রি করেছেন এক লক্ষ সতেরো হাজার টাকায়। গত সপ্তাহে দুইটা মোরগ বিক্রি করেছেন এক হাজার টাকায়। ছাগল বিক্রি করেন প্রতি বছর। তিনি বলেন :

“সারাদিন এসব কাজ করি বইলাই তো শরীর ভালা থাকে। পোলাপানরে ভালো কইরা খাওয়াইতে পারি, ঘরের ভাত খাইতে পারি, সংসারে টাকা-পয়সা দিতে পারি। আমার কোনো বিরক্ত লাগে না কাজ করতে। আমার ভালোই লাগে।”

১৯৭৪ সালের প্রথম জনসংখ্যা জরিপ অনুসারে দেশের অর্থনৈতিক কৃষিকাজের সাথে যুক্ত ছিলেন মাত্র ৬১০ জন নারী। ২০১৮ সালে প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুসারে কৃষিতে গ্রামীণ নারীর অংশগ্রহণ ছিল ৭২.৬ শতাংশ (তথ্যসূত্র : বণিক বার্তা)। কিন্তু জমিতে নারীদের মালিকানার হার খুবই কম। ২০২৩ সালের ১৭ এপ্রিল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যমতে, বাংলাদেশে ৯৬ শতাংশ জমির মালিক পুরুষ। কেবল ৪ শতাংশ জমির মালিকানা নারীর। এই ৪ শতাংশও আবার সমাজের ধনী শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নারীদের। বিপুল সংখ্যক নারী কৃষি শ্রমের সাথে জড়িত থাকলেও দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীদের জমির উপর কোন অধিকার নেই। অধিকাংশ নারী শ্বশুর কিংবা স্বামীর জমি চাষ করেন। নারীদের কৃষি কাজের স্বীকৃতিও দেওয়া হয় খুব কম।

রীণা বেগমও শ্বশুরের জমি চাষ করেন। রীণা বেগমের মতো আরো অনেক নারী আছেন, যারা আনন্দের সাথে কাজ করে যেতে চান। উৎপাদনের সাথে যুক্ত হয়ে পরিবারের সদস্যদের ভালো রাখতে চান। দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে চান।

নারীদের হাত ধরে কৃষি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কৃষি জমিতে মালিকানা প্রতিষ্ঠা হলে এবং কৃষি কাজের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে কৃষি প্রণোদনা পেলে কৃষাণীদের কৃষি কাজে অংশগ্রহণ আরো বাড়বে, যা দেশকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।

আরো পড়ুন

হেমন্তে বাঙলার কৃষাণী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাম্প্রতিকা