মঙ্গলবার, জুন ১১, ২০২৪
Homeআইন ও নারীকোর্ট ম্যারেজ: চরম মূল্য দিতে হতে পারে

কোর্ট ম্যারেজ: চরম মূল্য দিতে হতে পারে

নবম শ্রেনিতে পড়ুয়া হীরামনি (ছদ্মনাম) ভালোবাসে তার পাশের গ্রামের কলেজ পড়ুয়া রাজুকে (ছদ্মনাম)। স্কুল শেষে বাসায় পৌঁছে দেওয়া, ফুচকা খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া, ফোনে কথোপকথন, সবই চলতে থাকে সিনেমার গল্পের মতোই। একসময় তারা পরিবারের অমতে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাজু তার এক বড় ভাইয়ের পরিচিত উকিলের মাধ্যমে বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করে ফেলে এবং হীরামনিকে তা জানায়। নির্ধারিত সময়ে হীরামনি উপস্থিত হয় উকিলের চেম্বারে। রাজুও আসে, তার দুই বন্ধুকে সাথে নিয়ে। রাজুকে সে নিজের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করে। তাই নিজের কাছে কোন কাগজপত্র রাখার প্রয়োজন অনুভব করে না।

বিয়ের পরে একসাথে থাকা শুরু করে তারা। চলতে থাকে তাদের লাল- নীল সংসার। বেশ কয়েক মাস পর থেকে হীরামনি লক্ষ্য করে, রাজু দেরি করে বাসায় ফিরছে। তাকে আর আগের মতো সময় দেয় না। মনোযোগ নেই হীরামনির স্বাস্থ্যের প্রতি। কোন খেয়াল নেই রাজুর হীমনির প্রতি। হীরামনি একসময় গর্ভবতী হয়ে পড়ে। একদিন সে রাজুর সহপাঠীদের মাধ্যমে জানতে পারে, রাজু অন্য একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছে। এবং তাদের পরিবারের মধ্যে বিয়ের কথাবার্তা চলছে। বাসায় আসা বন্ধ করে দেয় রাজু এবং হীরামনিকে তার বাপের বাড়ি চলে যেতে বলে। তার পক্ষে আর একসাথে থাকা সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দেয় রাজু। ‍দিশেহারা হয়ে পড়ে হীরামনি।

হীরামনি আর কোন উপায় না পেয়ে থানায় যায়, তার অনাগত সন্তানের পিতৃপরিচয়ের জন্যে। থানা থেকে তার কাছে বিয়ের কাবিননামা চায়, বিয়ে প্রমাণের জন্যে। উকিলের শরনাপন্ন হলে সেও একই কথা জানায়। বিয়ে প্রমাণ করতে হলে, আদালতে প্রয়োজন হবে কাবিননামা।

দেনমোহর আদায় এবং সন্তানের বৈধতা প্রদানের জন্য হীরামনিকে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে বহু বছর। সন্তানের বৈধতা প্রমাণের পর দায়ের করা যাবে সন্তানের ভরনপোষনের মামলা। বোঝাই যাচ্ছে, ন্যায়বিচার পাওয়ার রাস্তা বেশ কঠিন।

কোর্ট ম্যারেজ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ন তথ্যঃ*

***কোর্ট ম্যারেজের সাথে ‘ম্যারেজ’ শব্দটি থাকলেও এটি আসলে কোন বিয়ে নয়।

***সাধারনত  প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে কোর্ট ম্যারেজের মাধ্যমে বিয়ে করে থাকে।

***তাদের ধারনা কোর্টে গিয়ে বিয়ে করলে পরবর্তীতে  কেউ ঝামেলা করতে পারবে না।

***কোর্ট ম্যারেজের ধর্মীয় কোন বৈধতা নেই।

***কোর্ট ম্যারেজের আইনগত কোন ভিত্তিও নেই।

কোর্ট ম্যারেজ কী:

সাধারনত একজন আইনজীবীর মাধ্যমে কোন ছেলে এবং মেয়ে ২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে নোটারী পাবলিক কিংবা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বিয়ের ঘোষনা দিয়ে যে হলফনামা করে, তা-ই কোর্ট ম্যারেজ নামে পরিচিত। এটি একটি বিয়ের ঘোষনা, বিয়ে নয়।

যে সকল সমস্যায় তারা পরতে পারে:

এ ধরনের বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েরা সন্তানের ভরন-পোষন, বিবাহ-বিচ্ছেদ, দেনমোহর এবং সন্তানের পিতৃত্বের অধিকার চাইতে কোর্টের দ্বারস্থ হোন। সমস্যা যেটাই হোক না কেন, প্রথমেই প্রয়োজন হবে বিবাহ বৈধ কি-না, তা প্রমাণ করার। কিন্তু এই কোর্ট ম্যারেজের ক্ষেত্রে যে হলফনামা প্রদান করা হয়, তা দিয়ে প্রচলিত আইনে কোন প্রতিকার পাওয়া যায় না। ফলে ভুক্তভোগীরা বছরের পর বছর কোর্টের বারান্দায় ঘুরে জীবন পার করে দেন।

কীভাবে বৈধ বিবাহ করা যায়:

১.ছেলের বয়স ২১ এবং মেয়ের বয়স ১৮ হতে হবে (বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ )

২.সাক্ষী: দুই জন পুরুষ বা একজন পুরুষের সাথে দুই জন নারী সাক্ষী।

৩. দেনমোহর ধার্য করতে হবে।

৪.অবশ্যই কাবিননামা রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

যদি বিয়ের কাবিন রেজিস্ট্রেশন করা না হয়, তাহলে স্ত্রী মোহরানা আদায় করতে পারবে না। অনেক সময় স্বাক্ষীগণ ছেলের পরিচিত হওয়ায় তারা আদালতে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করতে পারে।

তাই কাবিননামা ব্যতীত বিয়ে প্রমাণ করাই কঠিন হবে এবং এক্ষেত্রে প্রতারিত হবার সম্ভাবনা থেকে যাবে। এক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে উভয়েই প্রতারিত হতে পারেন।

মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী যেক্ষেত্রে একজন নিকাহ রেজিস্টার ব্যতীত অন্য ব্যাক্তি দ্বারা বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়, সেক্ষেত্রে বর বিবাহ অনুষ্ঠানের তারিখ থেকে পরবর্তী (৩০) ত্রিশ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্টারের নিকট প্রতিবেদন দাখিল করবেন।

হিন্দু আইনে কোর্ট ম্যারেজের অবস্থান:

হিন্দু বিয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই হিন্দু আইনের প্রথা মেনেই বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে এবং কোর্ট ম্যারেজের মাধ্যমে বিয়ে করলে তা বৈধ হবে না । যদিও হিন্দু বিয়েতে এখন পর্যন্ত বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়নি। প্রচলিত হিন্দু প্রথা না মেনে হলফনামা করা হলে, এতে বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল বলা যাবে না।

👉 কোর্ট ম্যারেজের ক্ষেত্রে যে পেপার দেওয়া হয় তার   নাম হলফনামা।

👉 কাজীর মাধ্যমে সঠিক পদ্ধতিতে যে বিয়ে পড়ানো হয়, তার নাম নিকাহনামা।

আপনার একটু সতর্কতা আপনকে অহেতুক দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা থেকে মুক্তি দিবে। তাই আইন জানুন, সচেতন হউন। কোর্ট ম্যারেজকে না বলুন। তা না হলে চরম মূল্য দিতে হতে পারে।

http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-details-476.html

আরো পড়ুন

3 COMMENTS

  1. কোর্ট ম্যারেজ সম্পর্কে আমাদের দেশের অনেক মানুষের মাঝেই ভ্রান্ত ধারণা আছে, অনেকেই মনে করেন কোর্ট ম্যারেজ মানেই বিয়ে।

    এই পোস্টে কোর্ট ম্যারেজ সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে এতে করে কোর্ট ম্যারেজ সম্পর্কে মানুষ অনেককিছুই জানতে পারলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাম্প্রতিকা