মঙ্গলবার, জুন ১১, ২০২৪
Homeঅর্থকড়ির জগৎআন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস: ছিনতাই এবং পণ্যায়ণ

আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস: ছিনতাই এবং পণ্যায়ণ

সভ্যতার সৃষ্টি এবং বিকাশে উৎপাদনের সাথে যুক্ত শ্রমজীবী মানুষ যেমন প্রধান ভূমিকা ভূমিকা পালন করেছেন, তেমনি যুগে যুগে সভ্যতার সৃষ্ট জঞ্জাল সরাতে তারাই অগ্রণী ভূমিকার আসনে ছিলেন। কিন্তু অল্প কিছু সময়ের জন্য হাতে গোনা দুয়েকটা দেশ ছাড়া ক্ষমতার শীর্ষে, নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে না পারায় বারবার তাদের অর্জনগুলো, সংগ্রামগুলো বেহাত হয়ে গিয়েছে, বেহাত হতে পেরেছে!

কোন যুগান্তকারী ঘটনা, সংগ্রাম, দর্শনকে স্বীকৃতি দিতে এবং বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে সে চেতনাকে ছড়িয়ে দিতেই মূলত দিবস পালনের ধারণার উদ্ভব। আজকের দিনে আমরা যে দিবসকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ বলে উদযাপন করি, সেটাও শ্রমজীবী মানুষের সংগঠিত সংগ্রামের সাথে, তাদের রুটি-রুজি, জীবনমান উন্নয়নের সাথে, তাদের সংগ্রামী চেতনাকে স্বীকৃতি এবং দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। সেসব লক্ষ্য নিয়েই এর সাথে যুক্ত শ্রমিক শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গী ধারণ করা উদ্যোক্তারা ১৯১১ সাল থেকে শুরু করেছিলেন ‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস’।

১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ আমেরিকার সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা মজুরি-বৈষম্য, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কর্মস্থলের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেছিলেন এবং রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিলেন বিক্ষোভ জানাতে। বিক্ষুব্ধ সেই শ্রমিকদের উপর চলে নির্যাতন, গ্রেফতার। ১৯০৮ সালে কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা, মজুরি বৃদ্ধি ও ভোটাধিকারের দাবিতে প্রায় ১৫ হাজার বিক্ষুব্ধ নারী শ্রমিক নিউইয়র্ক শহরে আবারও নেমে আসেন। তাদের সেইসব সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় অর্জিত হয়েছে আট ঘণ্টা কর্ম দিবস, ট্রেড ইউনিয়ন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অধিকারসহ বেশ কিছু অধিকার, যা অনেক পুঁজিবাদী দেশও স্বীকার করে নিয়েছে এবং বাস্তবায়ন করেছে।

আজকের নারী দিবসে শ্রমিক নারী, শ্রমিক শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গী নাই হয়ে গেল কেন? শ্রমিক শ্রেনি কি আজকাল স্বর্গসুখে বসবাস করছেন? বাংলাদেশের কথা যদি বলি, ১৮৫৭ সালের শিকাগো শহরের ঘটনার পরে প্রায় দুইশো বছর হতে চলেছে। এখনো এখানে কিছু দিন পর পর শ্রমিকদের আগুনে পুড়িয়ে, ভবন ধ্বসিয়ে মারা হচ্ছে। মারা হচ্ছে, সেই প্রায় পৌনে দুইশো বছর আগের মতো মিছিলে লেঠেল বাহিনী দিয়ে গুলি চালিয়ে। অধিকাংশ কারখানায়ই নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার কোন বালাই নেই। ট্রেড ইউনিয়ন বলতে আছে মালিকদের ভাড়া করা লোক দিয়ে তৈরি সার্কাস সংঘ। মজুরি বলতে আছে পরের দিন কারখানায় যাতে কোন রকম বেঁচে ফিরতে পারেন তেমন কিছু। বিদেশি পত্রিকার মারফত জানতে পারি ( দ্য গার্ডিয়ান, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৩), এখানে স্ত্রী সন্তানকে একা ফেলে যাওয়া রুবি রফিকের মতো নারী শ্রমিককে সন্তানদের নিয়ে ঘরভাড়া দিয়ে কোন রকম খেয়ে পরে বাঁচার জন্য, দিনে কারখানায় শ্রম দিয়েও প্রচণ্ড শীতের রাতেও বাধ্য হয়ে খদ্দের খুঁজতে ঘরের বাইরে দাঁড়াতে হচ্ছে। আর এই তো কয়েক মাস আগেও, বাঁচার মতো মজুরি অর্থাৎ ২৫ হাজার টাকা নূন্যতম মজুরির দাবিতে রাজপথে নামলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকের উপর দফায় দফায় নির্বিচারে গুলি করে ৪ জন জন শ্রমিককে মেরে ফেলা হলো। এই মৃত শ্রমিকদের নামের তালিকায় আঞ্জুমান নামের একজন নারী শ্রমিকও রয়েছেন।

শ্রমিক শ্রেণির নারীর আর মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির নারীর সমস্যা, প্রয়োজন, লক্ষ্য কি এক? এক না! দেশে দেশে এখনো যেখানে শ্রেণি, শ্রেণি শোষণ, শ্রেণি সংগ্রাম বিরাজমান রয়েছে, সেখানে শ্রমিক শ্রেণির অর্জিত এবং শ্রমিক শ্রেণির চেতনাকে ধারণ করা কোন দিবসকে পুঁজিবাদী দেশগুলোর নেতৃত্বে পরিচালিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার রক্ষক কোন প্রতিষ্ঠান দিয়ে সার্বজনীন করার মানেই হলো সেখান থেকে শ্রমিক শ্রেণির চেতনাকে হাপিশ করে দেওয়া। হয়েছেও তাই! এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সমাজতান্ত্রিক ব্লক ও পুঁজিবাদী ব্লকের মধ্যে তীব্র ঠাণ্ডা যুদ্ধ, পুঁজিবাদী দেশগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে দেশে ক্যু ঘটিয়ে স্বৈরশাসকদের ক্ষমতায় আসীন করা, তাদের মাধ্যমে কমিউনিস্টদের নির্বিচারে দমন গনহত্যা, ধর্মকে ব্যবহার করে কমিউনিস্ট বিরোধী প্রচার প্রচারণা, মতাদর্শিক প্রশ্নে সমাজতান্ত্রিক ব্লকের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া বিভক্তি, ক্রমান্বয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পতনের দিকে এগিয়ে যাওয়া, অবশেষে শীতল যুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক ব্লককে পরাজিত করে পুঁজিবাদী ব্লকের জয়, দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণির পার্টিগুলোর খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ চরম মাত্রায় চলে যাওয়া ইত্যাদি শ্রমিক শ্রেণিকে অনেক দুর্বল করে দেয়। তাই আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এখন আর শ্রমিক নারী, শ্রমিক শ্রেণির নারীদের সমস্যা, প্রয়োজন, অধিকারের আওয়াজ, শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লবের ধ্বনি উচ্চারিত হতে দেখা যায় না। ব্যতিক্রম কিছু ক্ষেত্র থেকে আওয়াজ হলেও উৎপত্তিস্থলেই সেই আওয়াজ লীন হয়ে যায়।

ফরাসি বিপ্লবে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে যুদ্ধের বিরুদ্ধে, রুশ বিপ্লবে, বিগত শতকের ৫০, ৬০ ও ৭০ এর দশকে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বিকাশে তৎকালীন বিপ্লবী নারী সংগঠনগুলো যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। এতে পুঁজিবাদী দুনিয়ায় কাঁপন ধরে যায়। তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে তাদেরই রক্ষাকারী সংগঠন জাতিসংঘ! ১৯৭৭ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘ।

যে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসের প্রেক্ষাপটের জন্ম হয়েছিল, পুঁজিবাদীদের সীমাহীন মুনাফাকে চ্যালেঞ্জ করে অর্থাৎ এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে। পুঁজিবাদী দেশগুলোর সংগঠন জাতিসংঘের মাধ্যমে সেই সংগ্রামী চেতনাকে ধামাচাপা দেওয়া হলো শ্রেণি নিরপেক্ষ নারী দিবস বানিয়ে দিয়ে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজকাল উৎসবে পরিনত হয়েছে, পরিনত করা হয়েছে। যেমনটা করা হয়েছে ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বরকে। ১৯৭১ সালের আগে ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল প্রতিরোধ দিবস। ৭৩ সালে করা হয় শোক দিবস। বর্তমানে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। অথচ বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৯ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবে মারা যায়। (তথ্যসূত্র-শ্রমিক)

খৃষ্টধর্ম জন্মলগ্নে ছিল আশাহত, আশ্রয়হীন, অসহায় মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন। কিন্তু যখনই শাসকশ্রেনি রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে খৃষ্টধর্মকে গ্রহণ করে তখন থেকেই তা হয়ে ওঠেছে সেইসব আশাহত, অসহায়, আশ্রয়হীন মানুষের বিরুদ্ধে শাসকশ্রেণির নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে। তাই শাসক-শ্রেণি যখনই বিপুল জনগোষ্ঠীর কোন দর্শনকে, অর্জনকে স্বীকৃতি দিতে চায়, পৃষ্ঠপোষকতা করতে চায়, তখনই বুঝতে হবে সেখানে তাদের কোন না কোন স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস থেকে শ্রমিক শ্রেণির স্পিরিট, শ্রমজীবী নারীদের সমস্যা, অধিকার, দাবি, লড়াইকে নাই করে দিয়ে একইসাথে এই দিবসকে পণ্যায়ণও করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। ২০১৮ সালে বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহার করা রঙের প্রস্তুতকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘প্যানটোন’ বেগুনি রঙকে অসীম ও সম্ভাবনাময় রঙ হিসেবে আখ্যায়িত করে একে বর্ষসেরা রঙ হিসেবে ঘোষণা দেয়। তাদের মতে, দেখা না গেলেও সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি জানান দেয় মহাকাশের অতি শক্তিশালী অস্তিত্বকে। প্যানটোনের সেই ব্যখ্যার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, বেগুনি ঠিক নারীর মতোই স্বতন্ত্র, সম্ভাবনাময় ও শক্তিশালী। এসবই মূলত বাণিজ্যের জন্য বেগুনিকে ব্রাণ্ডিং করা। সেই সাথে  মধ্যবিত্ত নারীদেরও তাদের প্রাপ্য অধিকার ও সুযোগ সুবিধা থেকে দূরে সরিয়ে রেখে তাদের আরও বেগার খাটিয়ে নেয়া এবং প্রান্তিক করে রাখার সুকৌশল ছাড়া আর কিছুই না!

নারীবাদী আন্দোলনের সূচনা থেকেই মর্যাদা, আভিজাত্য, ন্যায়বিচার, সততার প্রতীক হিসেবে বেগুনিকে কেউ কেউ দেখে এলেও, সেই বছর থেকেই বেগুনি নারী দিবসের সাথে অনেকটা আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়ে যায়। আজকাল এই বেগুনি কালারের শাড়ি-জামা- গয়না-ফুল ইত্যাদি কেনা, উপহার দেয়া, পরিধান করে শুভেচ্ছা বিনিময়, বিভিন্ন কোম্পানির নারী পণ্যে বিশেষ ছাড় বা বিনামূল্যে বিতরণ ইত্যাদিতে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস উদযাপন আটকে গিয়েছে। যেনবা বেগুনি কালার শরীরে ধারণ করলেই তারা মর্যাদাবান হয়ে যাবেন, ন্যায়বিচার পেয়ে যাবেন। অথচ তারা চূড়ান্ত মাত্রায় বিচ্ছিন্ন, রাজনৈতিকভাবে অসচেতন, অসংগঠিত। এই দিনে মধ্যবিত্ত শ্রেণির নারীদের সম্পত্তির সমান উত্তরাধিকারের মতো কিছু দাবি ও সমস্যার কথা একটু আধটু সামনে এলেও শ্রমিক শ্রেণির নারীরা আলোচনার প্রান্তিকেও কদাচিৎ থাকেন না।

কোন দেশের সমাজের বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে হলে, এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে, সবার আগে সেই দেশের সমাজের প্রান্তে অবস্থান করা শ্রমিক শ্রেণির বিকাশ, অগ্রগতি জরুরি। আর নারী শ্রমিক ও অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত প্রান্তিক শ্রমজীবী নারীরা সেই প্রান্তেরও প্রান্তে অবস্থান করা জনগোষ্ঠী।

তাই এবারের ৮ মার্চের অঙ্গীকার হউক, ছিনতাই হয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসের চেতনা, সংগ্রাম ও দৃষ্টিভঙ্গীর পুনরুদ্ধার ও পুনরুজ্জীবিত করা।


ছবি: ইন্টারনেট থেকে নেওয়া।

আরো পড়ুন

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাম্প্রতিকা