১
নাসরিন খন্দকারের ‘পুতুলখেলার রাজনীতি | বারবি কাহিনী’ বইটা পড়তে পড়তে বেশ কিছু প্রশ্ন জাগলো মনে। সেই প্রশ্নগুলো নিয়েই আলুথালু কিছু কথা বলবো। তার আগে একটু স্মৃতিচারণ করার দরকার বোধ করছি।
আমি নেহাতই গ্রাম থেকে উঠে আসা এক ‘ব্যাটামানুষ’। শৈশব-কৈশোর গ্রামেই কেটেছে। তো, গ্রামের ছেলে হিসেবে আরও দশজনের মতো মূলত ‘পুরুষালি’ খেলাটেলা খেলেই আমি বড় হয়েছি। যদিও স্মৃতি হাতড়ালে এমন অজস্র বিকেল পাওয়া যাবে, যে বিকেলগুলো কাটিয়েছি মেয়েদের সাথে ‘কুসুম কুসুম’, ‘জুতা তোলাতুলি’, ‘কুমির কুমির’ বা ‘কপাল টিক্কি’ খেলে। এই খেলাগুলোয় দৌঁড়ঝাপ আছে যথেষ্ট, তবে তা সত্ত্বেও এগুলো বাড়ির উঠোনে খেলা যায়। ফলে ছেলেমেয়ে একসাথে খেলতে অসুবিধা হতো না। তবে আমাদের ক্রিকেট-ফুটবলে মেয়েদের প্রবেশাধিকার খুব একটা ছিল না।
পুতুলখেলা আমার কখনোই ভালো লাগেনি। সেই শিশুকালে একে মনে হতো একান্তই মেয়েলি খেলা যাতে কোন প্রতিযোগিতা নেই, কোন উত্তেজনা নেই। মনে পড়ে আমরা ছেলেরা প্রায়শই পুতুলখেলা নিয়ে হাসাহাসি করতাম এবং আমরা যে ওটা খেলি না এটা নিয়ে আবছা এক ধরনের গর্ববোধও ছিল। আমরা ভালোবাসতাম ভাঙচুর, হৈ-হুল্লোড় আর প্রতিযোগিতা। আর আমাদের বোনেরা ঈদের সময় লাল-সাদা মাটির পুতুল কিনতো, নিজ হাতে পুতুল বানাতো (কখনও মাটির, কখনও কাপড়ের), পুতুলের বিয়ে দিতো, সংসার গড়তো। মাঝেমধ্যে তারা নিজেরাই মা সাজতো, কন্যা সাজতো। রাগঝাগ, কান্নাকাটিও করতো মিছেমিছি। ঘর-সংসার ব্যাপারটার সাথে যে মেয়েদের এক বিশেষ সম্পর্ক আছে, মানে এটা যে বিশেষ করে তাদেরই জন্য, সেটা সম্ভবত প্রথম বুঝেছিলাম ‘মেয়েদের পুতুলখেলা’ দেখে। মনে হতো এগুলোই মেয়েদের পছন্দের জিনিস। আমাদের ভাঙচুরের জগত থেকে তাদের জগত অনেক দূরে।
আমার সেই বোন আর সমবয়সিনীরা আজ আর কেউ পুতুল খেলে না। সত্যিকারের জীবন-সংসারে আজ তারা প্রায় প্রত্যেকেই নিমজ্জিত। অনেকেরই সন্তান হয়েছে এবং অনেকের মেয়েই হয়তো আজ পুতুলখেলায় মগ্ন। পুতুলখেলার এই ইতিকথা নিয়ে অনেক স্মৃতিকাতর গল্প-উপন্যাস লেখা সম্ভব। হয়তো লিখবোও। তবে আজ আর পুতুলখেলা ব্যাপারটাকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘প্রাকৃতিক’ মনে হয় না। মেয়েরা যে পুতুলই খেলবে এবং খেলে যাবে এটাকে বিধির বিধান বলে মেনে নিতে পারি না আর। মনে হয় আরও অনেক কিছুর মতোই এটাও পুরুষের নির্মাণ এবং পুরুষের জারি করা বিধান। সংসারধর্মের যে দীক্ষা না থাকলে ‘নারী’ হওয়া যায় না, সেই দীক্ষাপ্রাপ্তিরই সূচনা হয়তো পুতুলখেলায়। সে হিসেবে এই পুতুলখেলার রাজনীতিকে বেশ ধূর্তই বলতে হবে। যে শৈশবের নস্টালজিয়া জীবনের এতো বড় ও এতো ব্যক্তিগত সম্পদ, সেই শৈশবকেই যখন নারীবাদী লেন্সে ফেলে দেখি তখন অনেক কিছুকেই স্রেফ স্বাভাবিক আর নিষ্পাপ বলে আজ আর মেনে নিতে পারি না।
২
‘পুতুলখেলার রাজনীতি | বারবি কাহিনী’ বইয়ের শুরুটা হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক নির্মাণ হিসেবে পুতুলখেলার এই দীক্ষামূলক ভূমিকার আলোচনা দিয়ে। অনেকটা আমার মতোই লেখকও নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করেছেন, নারী হিসেবে অনুভব করেছেন কীভাবে ‘বিয়ে’ ‘সংসার’ বা ‘মাতৃত্ব’-র মতো সামাজিক নির্মাণগুলিকে পুতুলখেলার মাধ্যমে মেয়েদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় এবং এই নির্মাণগুলির সাথে মেয়েদের প্রচলিত সম্পর্ককেই ‘কমন সেন্স’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বলা যায়, এরপরই শুরু হয়েছে বইয়ের মূল আলোচনা। ২০১১ সালে প্রকাশিত এই ছোট্ট বইয়ে লেখক খুব অল্প কথায় বেশ কিছু প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন, যা একুশ শতকের বাংলাদেশে কথিত ‘নারীর ক্ষমতায়ন’-এর ফাঁকফোকর বোঝার ক্ষেত্রে খুবই প্রাসঙ্গিক। সেই আলোচনা বার্বি পুতুল থেকে বহুসংস্কৃতিবাদী রাজনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত এবং যথেষ্ট সমৃদ্ধ। আধুনিক পুঁজিবাদ-শাসিত সমাজে বার্বিডলের ভূমিকা বিষয়ে লেখক বিস্তারিত লিখেছেন। সেই আলোচনার প্রত্যেকটা পয়েন্ট নিয়ে আমি কথা বলবো না, তাতে পুনরুক্তি বাড়বে (আগ্রহী পাঠক বইটাই পড়ে নিবেন বলে আশা করি)। আমি এখানে বিউটি আইকন হিসেবে বার্বিডল সারা দুনিয়ায় নারী-মনস্তত্ব জুড়ে যে ব্যাপক প্রভাব (বা কুপ্রভাব), সেই প্রেক্ষিতে বর্তমান বাংলাদেশে নারীদের ‘বিউটি স্ট্যান্ডার্ড’-এর গ্রহণ ও বর্জন নিয়ে কিছু কথা বলবো। বলা ভালো, কিছু প্রশ্ন রাখবো।
লেখক তাঁর আলোচনায় বার্বিডলের গোলাপি মেয়েলি জগতের প্রসঙ্গ এনেছেন। যে গোলাপি নারীত্বকে বার্বিডল ও তার নির্মাতারা নিরন্তরভাবে পুনরুৎপাদিত করে যাচ্ছেন, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। দেখিয়েছেন এই গোলাপি নারীত্বের মোহেই আজকের যুগের মেয়েরা খেয়ে না খেয়ে বার্বিডলের মতোই অতিচিকন ও সেক্সি হওয়ার চেষ্টা করছে (যদিও পুরোপুরি বার্বিডল হওয়া কখনোই সম্ভব না তাদের পক্ষে)। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার মাধ্যমে মেয়েদের এই প্রচেষ্টাকে কীভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে, তারও একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ তিনি দিয়েছেন।
মজার ব্যাপার হলো একুশ শতকের মেয়েরা ব্যাপকহারে লেখাপড়া করছে, এমনকি অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কর্মক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে নারীকে। কিন্তু নারীদেহ ও সৌন্দর্য-কেন্দ্রিক পুরুষতান্ত্রিক স্ট্যান্ডার্ডকে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা তাদের মধ্যে ব্যাপকহারে দেখা যাচ্ছে না। বরং তারা এই স্ট্যান্ডার্ডগুলোর ন্যায্যতা ও উপকারিতার ব্যাপারে এতোটাই কনভিন্সড যে, ক্ষেত্রবিশেষে নিজ নিজ দেহকেন্দ্রিক এই অতি-সচেতনতাকেই তারা ‘নারী স্বাধীনতা’ বা ‘আমার দেহ, আমার সিদ্ধান্ত’ আকারে পাঠ করে থাকে। হয়তো ভাবে, ‘মেদমুক্তিই নারীমুক্তি’। সামাজিক ও অর্থনৈতিক পর্যায়ে যথেষ্ট অগ্রসর থাকা নারীরাও নিজেদের ফ্যাশন-চিন্তা ও ফ্যাশন-চর্চার ক্ষেত্রে বার্বিডল বা প্রায় সমপর্যায়ের হলিউডি-বলিউডি বিভিন্ন আইকন দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন। এটা একটা আন্তর্জাতিক প্রবণতা। ফলে বাংলাদেশে পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের সবচেয়ে রমরমা ফসল দেখা যায় যে শহরে সেই ঢাকা শহরের বাসিন্দা হিসেবে ‘বিউটি স্ট্যান্ডার্ড’-র ব্যাপক সংক্রমণ আমি যেমন দেখতে পাচ্ছি, নারীবাদী অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে যুক্ত আরও অনেকেরই তেমনি এটা চোখ এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। নগর-পর্যায়ে এই সংক্রমণ বেশি, যেহেতু মুক্তবাজারের বেশি কাছে থাকেন নগরবাসীরা। তবে বিনোদন জগৎ ও সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে গ্রাম-মফস্বলেও ‘মোটা হওয়ার আতঙ্ক’ ছড়িয়ে পড়ছে মেয়েদের মধ্যে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে থেকেই তারা চেষ্টা করছে বিউটি স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলার। প্রশ্ন হচ্ছে, নারীবাদী হিসেবে আমাদের এখন করণীয় কী?
৩
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের নানী-দাদী বা মা-খালাদের তুলনায় একুশ শতকের বাংলাদেশের মেয়েরা শিক্ষাদীক্ষা ও জীবিকা গ্রহণের দিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে গেছেন। এই এগিয়ে যাওয়া যেমন সংখ্যাগত, তেমনি গুণগতও। সরকারি বয়ানের ‘নারীর ক্ষমতায়ন’-র পুরোটাই তো মিথ্যা না। আবার পুরোটা সত্যিও না। নারীশিক্ষার ধরণ ও বিষয়বস্তু নিয়ে আমাদের সমাজে এখনও বিতর্ক চলমান। ‘নারীর পোশাক’ কিংবা ‘অশ্লীলতা’ নিয়েও উত্তেজিত বিতর্ক দেখা যায় প্রায়ই। প্রায় অনিবার্যভাবেই এই বিতর্কগুলো ইসলামিস্ট বনাম লিবারেল, পুরুষতান্ত্রিক বনাম নারীবাদী, প্রগতিশীল বনাম প্রতিক্রিয়াশীল, রক্ষণশীল বনাম আধুনিক, ডান বনাম বাম জাতীয় ঝগড়াঝাঁটির রূপ নেয়। মজার বিষয় হলো বিতর্কের বিষয় যারা, সেই নারীরা কিন্তু প্রায়শই এই ল্যাবেলগুলোর কোনটাই নিজের গায়ে টেনে নিতে চান না। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী ইসলামিস্টদের কড়া রক্ষণশীল নজরদারি থেকে যেমন মুক্ত থাকতে চান, তেমনি পশ্চিমা লিবারেল প্রত্যাশার ছাঁচে পুরোপুরি নিজেকে ঢেলে দিতেও তারা প্রস্তুত নন। জরিপ করলে হয়তো দেখা যাবে শিক্ষিত কর্মরত নারীদের বেশিরভাগই নিজেকে ‘নারীবাদী’ হিসেবে পরিচয় দিতে চাইবেন না, যদিও (মাত্রাভেদে) তারা নারীর ক্ষমতায়ন চান, নারী হিসেবে তাদের অধিকার সম্পর্কেও তারা সচেতন। এহেন পরিস্থিতিতে আমরা যদি নারীবাদী সক্রিয়তার জায়গা থেকে ‘বিউটি স্ট্যান্ডার্ড’ নিয়ে ভর্ৎসনার সুরে কথা বলি, তো সম্ভাবনা আছে যে বেশির ভাগ নারীই হয়তো আমাদের আলাপ এড়িয়ে যাবেন। আরও দশটা মতবাদের মতো নারীবাদও যদি ‘আদর্শ নারী’ বা ‘আদর্শ নারীবাদী’ জাতীয় কোন শক্ত ও অনমনীয় স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দেয়, সেই স্ট্যান্ডার্ডও খুব একটা হালে পানি পাবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশে খুব কম সংখ্যক নারীরই ‘নিখুঁত নারীবাদী’ হওয়ার দায় রয়েছে। এমনকি নাগরিক মধ্যবিত্ত নারীরা যারা অপেক্ষাকৃত মুক্ত জীবন যাপন করার সুযোগ পান, তারাও দেখা যাবে অন্তত বিউটি স্ট্যান্ডার্ডের প্রশ্নে ‘নিখুঁত নারীবাদী’ অবস্থানটাকে মেনে নিতে পারবেন না।
তবে বিউটি স্ট্যান্ডার্ড-র বিষয়টা যে কেবল নারীবাদী লেন্স থেকেই সমালোচিত, বিষয়টা এমন না। বার্বিডলের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ের একটা বৃহত্তর পটভূমি রয়েছে। নাসরিন খন্দকারের বই থেকেই আমরা খুব ভালোভাবেই জানতে পারছি একুশ শতকের দুনিয়ায় পুঁজিবাদ আর পুরুষতন্ত্র একটা আরেকটাকে শক্তিশালী করছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা মিউটেশনের মাধ্যমে আরও বেশি শক্তিশালী হতেও সাহায্য করছে। নারী-সৌন্দর্যকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পণ্যে পর্যবসিত করতে চলমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আগ্রহের কোন কমতি নেই। কারণ সেখানে ব্যাপক মুনাফা আছে। নাসরিন খন্দকার যেমন দেখাচ্ছেন একসময় মেয়েরা পুতুল তৈরী করতো নিজ হাতে, এখন তাদেরকে পুতুল কিনে দেওয়া হয় বাজার থেকে। বাজার তাদের হাতে যে পুতুল তুলে দেয়, সেই পুতুলকেই (যেমন বার্বিডল) তারা একসময় অনুকরণ করা শুরু করে (পরিবারের জায়গা নিয়েছে বাজার)। বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার মাধ্যমে একসময় তাদেরকে ভাবতে শেখানো হয় যে, পুতুলের মতোই সুন্দর ও সেক্সি হতে হবে। ফলে আমরা যখন বিউটি স্ট্যান্ডার্ডের বিরুদ্ধে কথা বলি, তখন যে ব্যবস্থা এই স্ট্যান্ডার্ড চালু রেখেছে তার বিরুদ্ধেই কথা বলি। আবার এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে আমাদের মাথায় একটা জিনিস খুব ভালোভাবেই ঢুকিয়ে দেয়: জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে একজন ‘ধনী কনজিউমার’ হওয়া। কনজিউমার হিসেবে যে যত বেশি ও যত বিচিত্রভাবে খরচ করতে পারে, আমাদের চোখে সে তত সফল ও স্মার্ট হিসেবে প্রতিভাত হয়। ফলে ভালো ভালো ব্রান্ডের জামা-জুতা পরাকেই একসময় সফল মানুষ হওয়ার লক্ষণ হিসেবে গণ্য করি আমরা। এমনকি নিওলেবারেল মতাদর্শে বিশ্বাসী বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থা যে সমস্ত উন্নয়ন-দর্শন ফেরি করছে আমাদের মতো অনুন্নত দেশগুলোতে, সেখানেও দেখা যায় খালি বাজার-বাহিত ‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন’-টাকেই উন্নয়ন হিসাবে প্রচার করা হয়। তাদের সেই উন্নয়নের সারমর্ম হলো যেদিন বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র ব্যক্তিটি ম্যাকডোনাল্ডের বার্গার খেতে পারবে এবং নিজের মেয়েকে দামি বার্বিডল কিনে পারবে, সেইদিনই বলা যাবে যে দেশে উন্নয়ন হয়েছে। কর্পোরেট আধিপত্য বা মুনাফা-ভিত্তিক মুক্তবাজারকে সেখানে কাঠগড়ায় তোলা হয় না। ফলে নারীবাদী অবস্থান থেকেই শুধু নয়, অনুন্নত দুনিয়ার একজন অধিবাসী হিসেবে নাগরিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেও একুশ শতকী মুক্তবাজারের বিরুদ্ধে সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
৪
আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত নারীবাদের যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আমরা দেখেছি, তাতে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলা করার কোন সদিচ্ছা খুব একটা দেখা যায় না। ধর্মীয় ও সামাজিক কিছু প্রথার বস্তাপঁচা সমালোচনার পুনরাবৃত্তি করেই এই নারীবাদ ক্ষান্ত হয় এবং এই নারীবাদেও ল্যাঙ্গুয়েজ ও বডি-ল্যাঙ্গুয়েজ দু’টোই বেশ চড়া। নারীর সামাজিক, শ্রেণীগত ও সাংস্কৃতিক ব্যাকগ্রাউন্ডকে আমলে না নিয়েই নারীর ‘পশ্চাৎপদতা’ নিয়ে ভর্ৎসনা করা হয় এই নারীবাদে। ফলে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীর কাছে এই নারীবাদ তেমন কোন কার্যকরী আবেদন বহন করে নিয়ে যেতে পারে না। আরও প্রশস্ত ও আরও কৌশলী না হলে এই দেশে নারীবাদ সবসময়ই জনবিচ্ছিন্ন অ্যাক্টিভিজমের পর্যায়ে থেকে যাবে। হিজাব দেখলেই ‘পশ্চাৎপদ’ কিংবা বার্বিডল দেখলেই ‘বিউটি স্ট্যান্ডার্ড’ বলে চিৎকার করে উঠলে স্বয়ং নারীসমাজ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে নারীবাদ।
রোক্সান গে তার ‘Bad Feminist’ প্রবন্ধে এ বিষয়টা নিয়ে খুব মূল্যবান কিছু কথা বলেছিলেন। তিনি মেনে নিয়েছিলেন, নারীবাদী হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজেও সামাজিকভাবে গড়ে ওঠা কিছু সমস্যাজনক ও পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার বাইরে পুরোপুরি যেতে পারেন না। তিনি নিজেই এমন অনেক সিনেমা, গান বা চিত্রকর্ম উপভোগ করেন যেখানে নারীকে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হয়েছে। এর মানে কি তিনি নারীবাদী নন? রোক্সান গে নারীবাদের পারফেকশনিস্ট ধারণার কড়া সমালোচনা করেছেন। কারণ একটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিটা চিন্তায় ও কাজে ‘পারফেক্ট নারীবাদী’ হওয়া কোন নারীর পক্ষেই সম্ভব না। এই সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই আমাদেরকে অগ্রসর হতে হবে। কারণ আমাদের লক্ষ্য নারীর সর্বাঙ্গীণ মুক্তি। প্রতিটি নারীকে ঘোষিত নারীবাদীতে পরিণত করা আমাদের উদ্দেশ্য না। এখানে কেউ যদি ‘bad feminist’-ও হয়, তো তাকেও জায়গা দিতে হবে।
‘পুতুলখেলার রাজনীতি’-র ক্ষেত্রেও একই কথা। আইন করে পুতুলখেলা বন্ধ করে দিলেই তো ‘পুতুলখেলার রাজনীতি’-ও বন্ধ হয়ে যাবে না। বা আইন করে বিউটি পার্লার বন্ধ করে দিলে বা বার্বিডল কেনা-বেচা নিষিদ্ধ করে দিলেই যে ‘বিউটি স্ট্যান্ডার্ড’ অচল হয়ে যাবে, ব্যাপারটা এমনও না। স্বয়ং নারীই যেখানে কনভিন্সড সেখানে ব্যক্তির চেতনায় যদি ‘পুতুলখেলার রাজনীতি’-র বিরুদ্ধে সক্রিয়তা তৈরী না হয়, তো পুতুল না থাকলেও পুতুলখেলা থেকেই যাবে কোন না কোন আকারে বা প্রকারে। আমরা যেটা পারি সেটা হচ্ছে ধর্মবোধ, ধর্মচর্চা, শ্রেণী ও মতাদর্শ নির্বিশেষে প্রতিটি নারীর কাছে বোধগম্য ভাষায় বার্বিডলের রাজনীতির বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী সেটা সবিস্তারে পৌঁছে দেওয়া। নাসরিন খন্দকারের বইটা সেরকমই একটা প্রচেষ্টা। তবে এরকম প্রচেষ্টা আরও লাগবে। আরও ব্যাপকভাবে লাগবে।
